ঠুল্লো।। তালাশ তালুকদার।। প্রথম পর্ব | শিল্প-সাহিত্য | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি

ঠুল্লো।। তালাশ তালুকদার।। প্রথম পর্ব

তালাশ তালুকদার

প্রকাশিত: ১০ মে ২০২১ ২০:২১ আপডেট: ১০ মে ২০২১ ২০:৩৩

তালাশ তালুকদার | প্রকাশিত: ১০ মে ২০২১ ২০:২১

UCBL

ঠুল্লো/ প্রচ্ছদ

এক.

ছোটবেলা থেকেই গ্রামের এক বড় ভাই নজরুলকে লেনিন নামে ডাকতো। ডাকার সময় স্লোগানের মতো করে বলতো, লেনিন লেনিন লেনিন চাই, লেনিন ছাড়া গতি নাই। তখনও নজরুল বোঝে নাই এই লেনিন কোন লেনিন? তখনও নজরুল জানেনা এই লেনিন নামক মানুষটিকে কেনো স্লোগানের মতো করে ডাকা হচ্ছে? কিংবা তাকে ডাকারই বা অর্থ কি? বড় হয়ে বুঝলো এই লেনিন কমিউনিস্ট পার্টির লেনিন। যার হাত ধরে কমিউনিজম বিস্তর বিস্তার লাভ করেছিল। কিন্তু নজরুলকে লেনিন নামে সম্বোধন করে ডাকার মানেটা কি? তাহলে কি নজরুলের ঐ বড় ভাই নজরুলের ভেতর লেলিনের ছায়া দেখতে পেয়েছিলো?

নেতৃত্বের এক রূপ ছোটবেলা থেকেই তৈরি ছিল নজরুলের ভেতরে। সত্যিকার অর্থে ছোটবেলা থেকে নেতৃত্ব দিয়েও এসেছে জ্ঞাতে অজ্ঞাতে। কিন্তু সভ্যতা থেকে অনেক দুরে থাকা এ পাড়া মহল্লাতে কে বুঝবে কমিউনিজমের আদর্শ? যাদের জন্য কমিউনিজম প্রতিষ্টা করবে- যাদের জন্য লড়াই সংগ্রাম করবে তারাই তো নিজস্ব স্বার্থের মোহে ভিন্ন দলে নাম লেখিয়েছে। যারা বুঝতেছে যে, হ্যাঁ, তাদের কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করা জরুরি তারা আরো আগেভাগে ভাগছে। কেননা, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে তো তাদের পেট ফুলে ফেঁপে ডাবর করে তুলতে পারবেনা! আর সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যে ত্যাগস্বীকার করতে হয় তা জীবন বাস্তবতার কারণে অনেকের পক্ষেই তা করা সম্ভব হয়ে উঠেনা। ফলে, বেঁচে থাকার জন্য তারাও হয়ে যায় জনপ্রিয় দলগুলোর একেক ভৃত্য। একারণে অনেকের সব রাজনৈতিক জ্ঞান ভেতরে থাকার পরেও রাজনীতির মাঠে থাকা হয়না কিংবা রাজনীতিতে অনাগ্রহী হয়ে ওঠে। কিংবা এই অজপাড়া গাঁয়ে কমিউনিজমের ভবিষ্যত নাই ভেবে নজরুলের রাজনীতিও নাই হয়ে গেছে। কিন্তু এটা তো চিরন্তন সত্য যে, কমিউনিজম কখনো শেষ হবার নয়। যতোদিন পৃথিবীতে মানুষ নামক প্রানী থাকবে ততোদিন কমিউনিজমও থাকবে। হয়তো সে আসবে ভিন্ন রূপে, নজরুলের মতো মানুষদের লড়াই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। নিপীড়িত, শোষিত মানুষেরা দেখবে তাদের পাশে কেউ না কেউ কাঁধের উপর হাত দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মার্ক্সের চেতনাটা জ্বলজ্বল করবে মাথার উপর।

সে যাই হোক, নজরুলের গ্রামের বন্ধুরা চায় নজরুল রাজনীতিতে দক্ষ খেলোয়াড় হয়ে উঠুক। আগামী নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদের ভোটে দাঁড়াক। নজরুলের এতো এতো জনপ্রিয়তা নজরুলের বন্ধুদের খুব মোহিত করে।
-ইংকে জনপ্রিয় হলে তো হামি আকাশোত উড়নু হিনি বারে। -নজরুলের এক বন্ধু নজরুলকে বলে।

গ্রামে একখানা ক্লাব আছে ভিলেজ ভয়েজ নাম তার। সে ক্লাবের সভাপতির পদেও নজরুলকে রেখেছে নজরুলের বন্ধুরা। এতো কম বয়সে নজরুলের ঈর্ষান্বিত জনপ্রিয়তা সবাইকে তাক্ লাগায়। এতো কম বয়সেও নজরুলকে গ্রামের প্রাইমারি স্কুল কমিটি ও মসজিদ কমিটির সভাপতির পদ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। নজরুল যদি আগ্রহ দেখায় তাহলে গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুদের মন্দির কমিটি ও শ্মশান কমিটির সভাপতির পদও ছেড়ে দিতে চায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা।

হিন্দুর সম্প্রদায়ের লোকেরা বুঝতে পেরেছে যে, নজরুল অসাম্প্রদায়িক চেতনার লোক। তার হাতে যে কোনো ধর্মই নিরাপদ। তার কাছে সম্প্রদায়গত কোনো শ্রেনীবিভেদ নেই। একারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাই বেশি আগ্রহ দেখায় নজরুলকে ভোটে দাঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু নজরুলকে খুব বেশি টানেনা তাতে। প্রচলিত রাজনীতির নোংরা বালুর উপর হাঁটতে ভালো লাগেনা তার। রাজনীতি যে ভালো লাগেনা তাও না আবার। ভালো লাগেও; কিন্তু সে রাজনীতির ভেতর পরিচ্ছন্নতা থাকতে হবে এবং তা হতে হবে নীতি নৈতিকতা নির্ভর। বর্তমান রাজনীতির মতো রাজনীতি চলতে থাকলে সে রাজনীতিতে টিকতে পারবেনা কিংবা সে রাজনীতিতে খাপ খাওয়াতেও পারবেনা নিজেকে। ফলে, এই রাজনীতির মাঠ থেকে নজরুল নিজেকে দূরেই রাখতে চায়।

রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পেছনে আরো একটা কারণ আছে। সে কারনের পেছনে নজরুল লোকচক্ষুর আড়ালে প্রতিনিয়ত শুশ্রুষা করে যায়। কাউকে বুঝতে দেয়না, কাউকে জানাইও না ব্যাপারটা। এটা আসলে জানানোরও বিষয় না। সাধনার বিষয়। তাই ভেতরে ভেতরে আড়ালে আবডালে সাধনাটাই করে যায়। নজরুল বোঝে যে, প্রত্যক্ষ রাজনীতি করলে, মানে, মাঠের রাজনীতিতে ইনভলভ হইলে সে সাধনা মাঠে মারা যাবে। অর্থ্যাৎ, রাজনীতি ও লেখালেখি একসাথে দুটোই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবেনা তার পক্ষে। আর সম্ভব হইলেও দুটো ক্ষেত্রের কোনো একটা ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সাকসেস হওয়া সম্ভব হবেনা তার। একারণে তাকে যেকোনো একটি ক্ষেত্র চুজ করে নিয়ে সামনে এগোতে হবে নজরুলকে। হয় রাজনীতি করতে হবে নয়তো লেখালেখি চালিয়ে যেতে হবে।
পাড়ার মুরুব্বিরা বলে, যেডে করব্যার চাবু বাপ সেডের ভিতরে সান্ধাবু। তালে পরে তুই ঠিকানাত্ যাত্যা পারবু।

নজরুল চায় দেশের নামকরা শিল্পী-সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে। তাকে রাজনীতিবিদ হিসেবে না জানুক লোকজন। অভাবের তাড়না মেটাতে এতোদিন যা গন্ধ ছড়িয়েছে সে পর্যন্তই থাক। স্বয়ংসম্পন্ন হওয়া গেলে সেন্ট মেখে সে দুর্গন্ধ তাড়না যাবে, পরবর্তীতে।

নজরুল বুঝতে চেষ্টা করে যে, সমাজে যে বৈষম্য, শোষণ নিপীড়নের যন্ত্র চালু আছে তা থেকে জনগণকে মুক্ত করতে হলে রাজনীতিবিদ হিসেবে তা দুর করা সম্ভব হবেনা। কেননা, যে সিস্টেম সমাজ-রাষ্ট্রে চালু আছে তা একার পক্ষে দমন করা যাবেনা কখনোই। বরং দুষ্টচক্রের জালে পড়ে তাকেও ঐ পরিণতিই মেনে নিতে হবে। মানে, দেশে যে সিস্টেম চালু আছে সে সিস্টেমের ভেতর দিয়েই জট পাকাতে হবে তাকেও। অতএব, এ পথ তার নয়। সে যদি সত্যিকার অর্থেই জনগণের সুখ-দুঃখের ভাগিদার হতে চায় তাহলে তাকে লিখেই জনগণের পক্ষে থাকতে হবে। একারণে রাজনীতির চাইতে সাহিত্যকেই মূল উপজীব্য করে বাঁচতে চায় নজরুল। কিন্তু, বাঁধ সেধেছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। অর্থ্যাৎ, ২৪ ঘন্টার লেখক হিসেবে টিকে থাকতে হলে অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা খুবই জরুরি বিষয়। যদি হাতে টাকা না থাকে তাহলে কনসেন্ট্রেশন ভিন্ন দিকে যাবে। রোজগার করতে করতেই যদি দিন রাতের এক তৃতীয়াংশ সময় পার হয়ে যায় তাহলে লেখালেখি কিংবা সংসারধর্মই বা পালন করবে কখন? তাই বলে, সব লেখকই কি পেশাহীন? তারাও তো কর্মজীবি মানুষ। তারা তাদের কাজকর্ম করেও লেখালেখি চালিয়ে যেতে পারে তো! কিন্তু নজরুলের ধারণা এরকম গতানুগতিক চিন্তায় আটকায়ে নেই। নজরুল মনে করে যা করতে হবে তার পুরাটাই করতে হবে। সে হিসেবে যদি সাহিত্য রিলেটেড কোনো কর্ম জোটে তাহলেও না হয়। কিন্তু নজরুলের আরেক মন বলে, নাহ্, সাহিত্য রিলেটেড কোনো সংবাদ পত্রেও তার চাকরি হলে চলবে না। মানে, সেখানেও যেহেতু তাকে সময় ইনভেস্ট করতে হবে সেহেতু ফলাফলও একই দাঁড়াবে। যা করতে হবে তা তার মতো করে স্বাধীন হতে হবে। নইলে, কতোজন সাহিত্যিক এলো আর গেলো- কিন্তু কয়জন দাঁড়াতে পারলো? নজরুল এই হিসাবটাও করে রেখেছে। শুধু নিছক সাহিত্যিকের লেবেল গায়ে দিয়ে হাওয়া খাওয়ার চাইতে মাঠে ভেড়া চড়ানো অনেক ভালো কাজ মনে করে নজরুল। কিন্তু এই মুহুর্তে অর্থ বিত্ত ছাড়া কে কাকে পোছে? নজরুল যতোই ভালো লেখুক না কেনো অর্থ ছাড়া তাকে কেউ এক পয়সার দামও দেবেনা। বলা যায়, ইহকালীন দুনিয়ায় এটাই জলজ্যান্ত বাস্তব সত্যকথা। হয়তো মহাকালের ছামিয়ানার নিচে তার জায়গা হবে কিন্তু ভোগবাদী দুনিয়া তাকে নেবেনা।

নজরুলের চোখ মহাকালের দিকে তাকিয়ে আছে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহাররা দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশাপাশি নজরুল চায় Ñক্ষুধা থেকে, অভাবী চেহারা থেকে মুক্তি পেতে। সে দেখতে চায়না কোনো কবি, সাহিত্যিক ক্ষুধায় আচ্ছন্ন থেকে টগরবগর করে পথ হাঁটছেন।

সুকান্ত যেভাবে ক্ষুধায় কাতর হয়ে চাঁদকে ঝলসানো রুটি মনে করে চাঁদের মনোরম সৌন্দর্য্যকে কুৎসিত ভাবে উপস্থাপন করেছেন; নজরুল সৌন্দর্য্যকে এভাবে নষ্ট করে দিতে চায়না। নজরুল মনে করে, সুন্দরকে তার প্রাপ্য মর্যাদাই দিতে হবে। সে মনে করে জাতিকে পথ দেখাবে শিল্পী সাহিত্যিকেরা- সেই শিল্পী সাহিত্যিকেরাই যদি পশ্চাতে থাকে তাহলে কিভাবে একটা জাতিকে বুঝবে এই জাতিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। কে জানি বলেছিল, যদি কোনো জাতিকে বুঝতে এবং চিনতে চাও তাহলে সে জাতির সে সময়ের সাহিত্য, শিল্পকলা পড়ে দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে সে জাতি জাতি হিসেবে কেমন জাতি ছিল। সেকারণে যারা শিল্প সাহিত্য চর্চা করে তারা সর্বপ্রথমে মানুষ হিসেবে এগিয়ে থাকা মানুষ হতে হবে। আর মানুষেরা মানুষ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে তার নিজস্ব অর্থবাহুর উপরে। তাহলে নজরুলকে এই দেয়ালটাকেই আগে টপকাতে হবে। কিন্তু চাইলেই কি দ্রুত টপকানো যায়? তার জন্য তো সময়ের প্রয়োজন আছে। ধীরে ধীরে বাইতে হবে নৌকা। তবে এ কাজটা যে খুব সহজ হবে তাও না। তবে দরজায় ধাক্কা দিতে হবে- ধাক্কা দিয়ে দিয়ে ভাঙ্গতে হবে দরজায় লাগানো তালাখানা। হয়তো ধাক্কা দিতে দিতে সমাজের চোখে হেয় প্রতিপন্ন হতে পারে। হতে পারে অসামাজিক- গাড়ল কোনো। তবু তো হাতে পাবে চাবিখানা, খুলতে পারবে জীবনের কারখানা।

এই চাবি কেউ তোমাকে দেবেনা। অথচ দেওয়ার কথা ছিলো কারো। দায় ছিলো কারো।

(চলবে)

 

 

 

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top