ঠুল্লো।। তালাশ তালুকদার।। দ্বিতীয় পর্ব | শিল্প-সাহিত্য | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি

ঠুল্লো।। তালাশ তালুকদার।। দ্বিতীয় পর্ব

তালাশ তালুকদার

প্রকাশিত: ২০ মে ২০২১ ০৯:২৭ আপডেট: ২৩ জুন ২০২১ ০৭:৫২

তালাশ তালুকদার | প্রকাশিত: ২০ মে ২০২১ ০৯:২৭

UCBL

প্রচ্ছদ/  হাজ্জাজ তানিন

দুই.

চাবি উদ্ধার করতে যেয়েই নজরুল সমাজের কাছে অপদস্ত- অপমানিত হয়। সমাজ তাকে অসামাজিক বলে প্রচার করে বেড়ায়। তাহলে সামাজিক কে? কেনো সামাজিক? এসব প্রশ্ন চলে আসে সামনে।

সমাজে শ্রমিক যদি তার প্রাপ্য কিংবা ন্যায্য চাওয়াটাকেই অধিকার মনে করে চায় তাহলে কি সমাজ ব্যক্তিকে অসামাজিক সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করবে? এসব নানান প্রশ্নের জটলায় নজরুল দড়ির মতো প্রতি প্রশ্নে প্রশ্নে গিঁট্টু মেরে রেখে দেয়। পরে যদি এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় তাহলে সে গিঁট্টুগুলোকে খুলে অন্য বাঁধনে কাজে লাগাবে। তার উদ্দেশ্য যেহেতু সৎ সেহেতু কাউকে তোয়াক্কা না করে নিজের মতো সশব্দ করে হেঁটে যায় মাইলের পর মাইল, মরুভূমির পর মরুভূমি, সমুদ্রের পর সমুদ্র।

কিন্তু নজরুলকে অসামাজিক হওয়া চলবেনা। এটা নজরুলের প্রেমের শপথ। অর্থ্যাৎ নজরুল যাকে ভালবাসে তার প্রধানতম শর্ত এটাই। কেননা, নজরুল যদি অসামাজিক হয় তাহলে তার বাবা মার কাছে তার কথা বলতে পারবেনা।
দারুণ এক ম্যাথ দাঁড়ায়া থাকে নজরুলের সামনে। কিন্তু এ পরিক্রমা থেকে তাকে এ অংক কঁষেই বের হতে হবে। অনেকটা এরকম যে, লাঠিও ভাঙ্গবেনা পরন্তু সাপটাও মারা পড়বে। কিন্তু তা চাইলেই যদি সম্ভব হতো; যে চাইলেই সবকিছু হাতের মুঠোতে চলে আসবে। তাহলে তো হতোই।
Ñতালে পরে ক্যাং করে সংসার করবু? কে বিয়ে করবি তোক? সালাম কালামও দেওয়া শিখিসনি তো কাকো-! শ্বশুর গোষ্ঠিক যে সালাম-কালাম দেওয়া লাগপি সেডেও তো পারবু নো হিনি? এক বন্ধু বলে বসে। শুধু বিয়ে শাদীর ব্যাপারেই যে সামাজিক হতে হবে তা নয় ব্যাপারটা। জীবনের প্রত্যেক জায়গাতেই সামাজিক হয়ে উঠা জরুরি। তা না হলে প্রতি পদে পদে পস্তাতে হবে। কিন্তু লেখালেখি করতে যেয়ে প্রচল যা কিছু তাকে অস্বীকার করতে গিয়ে সমাজ থেকে ডেসপারেট হয়ে গেছে নজরুল। সে নিজে নিজে এর উত্তর খুঁজতে গেলে এর টিকিইও খুঁজে পায়না।
হ্যাঁ, ঠিকই তো- একেবারে ডেসপারেট, অসামাজিক এবং আপোষহীন ব্যক্তি যারা; সমাজে কিভাবে ডিল করবে তারা? যদি ডিল করতে যায় তাহলে তো সমাজের প্রত্যেকটা ফাংশনের সাথে আপোষরফা করতে হবে নজরুলকে। কিন্তু তা কি করে সম্ভব?

রাষ্ট্রের প্রত্যেক এরিয়াতেই তো সমঝোতা করা লোকের বসবাস। তাদের বিবেক বর্জিত কাজকে কিভাবে সমর্থন দেবে সে? নজরুল তো কখনোই সুবিধাবাদ জিনিসটাকে বোঝার চেষ্টা করেনি। কিংবা আয়ত্বে রাখারও লোভ দেখায়নি কখনো। তাহলে কিভাবে মেলামেশা, সমঝোতা করবে সে দুষ্টপরায়ন লোকেদের সাথে? সামান্য স্বার্থের জন্য কি অন্যের খারাপ কাজকে সমর্থন দিয়ে তার নিজের আখের গোছাতে হবে? এ কথা যাকে বলবে সে অন্যদিকে মুখ বেঁকা করে থাকে। বলে -থাক, তোমার যা মনে হয় তাই করো, নিজের মুরগী টিকনেত্ জবো করলে কার কি? হামার কওয়া হামি কলাম। তুমি সেডে পালন করবা না করবা না সেডে তোমার ব্যাপার।
এইখানেও, মানে প্রেম করতে গেলেও নজরুলকে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়া লাগে। সে ভেবে পায়না সবাই যদি তার দিক থেকে ক্রমে ক্রমে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে সমাজে টিকে থাকবে সে কি করে?

নজরুল তবু আগাইতে চায়। সমাজের যা কিছু মন্দ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। সে মনে মনে ভাবে, সে নিজে বদলে গেলেই তার দেখাদেখি সমাজের অন্যরাও বদলে যাবে, হয়তো। আগামীর সমাজের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হলে তাকে বদল হতেই হবে।

সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসাবে সে নিজেই জ্বলে উঠবে প্রথমে। কিন্তু সমাজ বদল করতে গেলে যে সমাজের মোড়লেরা তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে, তাকে নানা অপবাদে জর্জরিত করবে তাহলে সে কিভাবে আফসানাকে বিয়ে করবে? যাকে নিয়ে ঘর সংসার করার চিন্তা করে; সে আফসানাই তো নানান প্রশ্ন হাজির করে নজরুলের সামনে। সেখানে সমাজের অন্য লোকদের সে বোঝাবে কিভাবে যে, সে যা করছে তা সমাজ পাল্টানোর জন্য করছে। কিন্তু কেউ বোঝে না তাকে। একধরণের দীর্ঘশ্বাস সঙ্গী হয় তার।

আফসানার জন্য দিন দিন মন খারাপ হতে থাকে নজরুলের। নজরুল ভাবে, অন্তত আফসানা তো তাকে বোঝার কথা। সে না বুঝলে গোটা পৃথিবীই তো অবুঝ থাকবে। তাকে বোঝাতে না পারাটা কি নজরুলের ব্যর্থতা নাকি নজরুলকে বুঝতে না পারাটা সমাজেরই ব্যর্থতা? সে যাই হোক, অনেকদিন হলো আফসানার সাথে দেখা হয়না, কথা হয়না। ফলে, নজরুলের সামনে আফসানা নামটা উচ্চারিত হলেই ধ্বক্ ধ্বক্ করে উঠে বুকের ভেতরে। মনে হয়, ড্রামে স্টিকের বারি পড়তেছে একেকটা। মনে হয় আফসানার সাথে প্রেম করা আর নকশাল বাড়ির আন্দোলন করা একই কথা। মানে, আফসানার বাবা মা কে নজরুল সরকার পক্ষ মনে করে। আফসানার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা কিংবা আফসানার সাথে কথা বলা শুনতে পারলেই জেল জরিমানা হবে। কিংবা আফসানার বাবার এমন বৈভব, প্রতিপত্তি আছে যা খাটিয়ে নজরুলকে সমাজচ্যুৎ করারও ক্ষমতা রাখে।

নজরুলের পরিবারও যে আফসানাকে মেনে নেবে এমন নয়। কেননা আফসানার ট্যামট্যামি ভাব আর বড়োলোকি স্বভাব একদমই সহ্য করেনা নজরুলের পরিবার। নজরুল তার পরিবারের সাথে একবার কথা প্রসঙ্গে আফসানা সম্পর্কে যা মন্তব্য পেলো তার ফলাফল দাঁড় করালে এমন রেজাল্টই দাঁড় হয়।

নজরুল যার জন্য এত উতলা হয়ে দিনরাত কাটায় সেই আফসানা কি এমনভাবে অনুভব করে নজরুলকে। যদি এমন ভাবেই অনুভব করতো নজরুলকে তাহলে তো আফসানা যেকোনো ভাবেই হোক খোঁজ নিতো নজরুলের। যেহেতু আফসানা নজরুলের খোঁজ নেয়না সেহেতু সে কি অন্য কারো সম্পর্কে জড়িয়েছে নিজেকে? হয়তো নজরুলের বোহেমিয়ান জীবনটাকে পছন্দ হয়নি আফসানার। সেকারণে অন্যত্র গমন করলে আশ্চর্য্য হওয়ার কিছু থাকবেনা।

হয়তো আফসানা এখন পছন্দ করে মিডিয়া পাড়ার সেলিব্রেটি কাউকে। যেহেতু সে নিজেও একসময় টিভি মিডিয়ার তালিকাভুক্ত এংকর ছিলো। তাই নজরুলের এমন ভাবনা অমূলক নাও হতে পারে। তার পছন্দের তালিকাতে থাকতে পারে টিভি সিনেমা জগতের তারকা কাউকে। ফলে তার ভাল লাগার কথা না ভ্যাগাবন্ড কোনো কবিকে। আর কবিরা পাগল; সমাজ বহির্ভূত মানুষ। তার কপালে দুঃখ- কষ্ট ছাড়া কিইবা আছে। ফলে, নগদ প্রাপ্তি বলতে যা বোঝায় তা ঐ মিডিয়ার তারকাদেরই আছে। নগদ অর্থ, ভোগবিলাসি জীবন, দামী গাড়ি, ফ্ল্যাট কি নাই তাদের? বছর বছর বিদেশে পাড়ি জমানো থেকে শুরু করে অবকাশ যাপন করতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা যাদের কাছে তুচ্ছ; আফসানা তাদেরই বউ কিংবা গার্লফ্রেন্ড হয়ে আয়েশি জীবন যাপন করতে চায়।

এক্ষেত্রে আফসানাকে দোষ দেওয়াটাও ঠিক হবেনা নজরুলের। কেননা নিরাপদ এবং আয়েশী জীবন কে না চায় এ জগতে।

নজরুলের সাথে আফসানার সম্পর্ক বলতে গেলে জন্মের শুরু থেকেই। অর্থ্যাৎ, আফসানার ফ্যামিলি যা নজরুলের ফ্যামিলিও তা। অর্থ্যাৎ, আফসানাও চৌধুরী বাড়ির মেয়ে নজরুলও চৌধুরী বাড়ির ছেলে। আফসানার বাবা চাকুরি করার কারণে আফসানা জন্মের পর পরই গ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তর হয়ে যায়। আফসানা সেখানেই বড় হতে থাকে- পরিচিত হতে থাকে ঢাকার পপ কালচারের সাথে। এদিকে নজরুল ছোটবেলা থেকেই গ্রামে বসবাস করা ছেলে। বলা যায় গ্রামীণ কৃষ্টিকালচারেই সে পোক্ত হয়েছে।

পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগ নাই। সারাক্ষন লেখালেখি আর বোহেমিয়ান জীবনযাপন করাটাই তার লাইফের পার্ট হয়ে ওঠে। মাঝখানে দুই তিন বছর ব্যবসা করতে গিয়েও ব্যবসায় সফল হইতে না পারা মানুষ। সফল না হবার পেছনে যতোটা না নজরুলের দায় আছে তার চাইতে বেশি দায় নজরুলের ব্যবসায়িক পার্টনারদের।

ব্যবসা করতে গিয়ে নজরুল জীবন সম্পর্কে যে ধারণা পায় তা দিয়ে জীবনের বাকিটা সময় সে চলতে পারবে। এটা তার বিশ্বাস। নজরুল হাড়ে হাড়ে টের পায় যে মানুষ কতো হারামী। সমাজ কতখানি নোংরা ও স্বার্থপর। টের পায়, কিভাবে সমাজের স্বাধীন মানুষেরা বৃটিশদের চেয়েও শোষণপ্রিয়। নিজের ভাই হয়ে আরেক ভাইয়ের ঘাড়ের উপর বন্দুক রেখে কিভাবে শিকার করা যায় এবং অন্যকে ব্যবহার করে কিভাবে নিজের স্বার্থ হাসিল করা যায় তা এ ব্যবসাতে না এলে কিছুই বুঝতে পারতো না নজরুল।

ব্যবসা করতে এসে সে আরো টের পায় বন্ধুত্ব নামক শব্দটি কিভাবে রেপড হয় একে অপরের কাছে। আর সম্পর্কগুলো হয়ে যায় জারজ। ফলে, নজরুল বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে একেবারে ডিনাই করে দিয়ে নিজেকে নিয়ে নিজের ভেতরে গুঁটিয়ে পড়ে। এছাড়াও লেখক স্বত্ত্বাকেও চায় বাঁচাতে। লেখালেখির সাথে যেহেতু ব্যবসা করা কিংবা কর্পোরেট জব করা কন্ট্রাডিকশন সেহেতু নিজেও আর এগোয়নি সেদিকে। একারণে নিজের সন্ধানে নিজেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নজরুল। লাইফের সবটুকু সময় ব্যয় করে চলে নিজের পেছনে। কিন্তু এভাবে চলবে কেমন করে? বর্তমান জীবন ব্যবস্থা পরিচালনা করতে যেয়ে যে অর্থ ব্যয় হয় অন্তত সে উপার্জনটুকু থাকতে হবে তার। নয়তো এভাবে ভ্যাগাবন্ড হয়ে ঘুরতে থাকলে আফসানাকেই বা পাওয়া হবে কিভাবে তার?

(চলবে)




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top