বড় গল্প।। স্লিপিং পার্টনার।। রেজাউল করিম খোকন।। প্রথম কিস্তি | শিল্প-সাহিত্য | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি

বড় গল্প।। স্লিপিং পার্টনার।। রেজাউল করিম খোকন।। প্রথম কিস্তি

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২১ ১০:০১ আপডেট: ৩ জুন ২০২১ ১০:০৭

রেজাউল করিম খোকন | প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২১ ১০:০১

UCBL

প্রচ্ছদ/  হাজ্জাজ তানিন

এক
সকালবেলাটা কিচেনে ভীষণ ব্যস্ত থাকতে হয় রেহনুমার। নাস্তা তৈরির পর্ব সারতে না সারতে সে রান্নাবান্নার আয়োজন শুরু করে দেয়। কারণ, কাজের বুয়া শেফালি সকালে এসে থাকে কয়েক ঘণ্টা, তারপর কাজ শেষ করে চলে যায়। শেফালি থাকতে থাকতে রান্নাবান্নার কাজটা গুছিয়ে নিতেই রেহনুমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। একসময় বাসার রান্নাবান্নার সব কাজ নিজে একহাতে সামলালেও আজকাল কেন যেন পেরে ওঠেনা।
বয়সটা তেমন বেশি না হলেও এখন আগের মত হুহটাট ছুটোছুটি করতে মন চায় না কয়েকবছর আগে ৪০ পার করা রেহনুমার। নাহ, ডায়াবেটিস এখনও ছুঁতে পারেনি, মাঝে মধ্যে প্রেসারটা একটু বাড়লেও প্রায়ই নরম্যাল থাকে। যদিও আজকাল এই বয়সেই অনেক মহিলা ডায়াবেটিস , প্রেসার এবং অন্যান্য নানা মেয়েলি অসুখে অনেকটা কাবু হয়ে পড়ছে। আশেপাশে অনেককেই তো দেখছে সে। অথচ ৪০ পার করলেও দুর্দান্ত যৌবনা মনে হয় রেহনুমাকে। এখনও শরীরটা বেশ ফিট রয়েছে। ঝরঝরে চমৎকার ফিগারের জন্য নানাজনের প্রশংসা শুনতে হয় প্রায়ই। সমবয়সী, বান্ধবী, আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই ঠাট্টা করে বলে, ‘আরমান ভাই অনেক সুখে ভরিয়ে রেখেছে তো, তার ভালোবাসা, আদর পেয়ে দিনে দিনে আরো সুন্দরী হচ্ছো তুমি।’
রেহনুমা নিজে জানে, কতটা সুখে আছে সে। বাইরে থেকে দেখে কারো ভেতরটা জানা সম্ভব হয়না। যদি সে মুখ ফুটে কাউকে কিছু না বলে তাহলে মনের খবর জানবে কীভাবে? আজকাল ডিপ্রেসনটা ভেতরে ভেতরে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে। যে কারণে হঠাৎ হঠাৎ প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে। তখন বুকের ভেতরটাতে বেশ ধরফড় করে, ঘাড়ের কাছে হালকা চাপ এবং ব্যথা অনুভব হয়। ডাক্তার বলেছে , এসবই শরীর এবং স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। নিজে এতসব উপলদ্ধি করলেও এ থেকে মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেনা রেহনুমা। এক ধরনের কষ্ট, দুঃখ-বেদনা আর অতৃপ্তি-অসন্তুষ্টির যন্ত্রণা একা একা বয়ে বেড়াচ্ছে সে। তার মতো চারপাশে এরকম কষ্ট যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো অনেক মেয়ে হয়তো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদেরকে বাইরে থেকে দেখে বোঝার কিংবা উপলদ্ধি করার কোনো অবকাশ নেই। তার মনের খবর সে নিজেই শুধু জানে, আশেপাশের কেউ জানেনা, বোঝেনা। এমন কি তার খুব কাছে থাকা অতি আপনজন স্বামী কিংবা সন্তানও বুঝতে পারেনা, জানতে পারেনা।
চুলায় কড়াইয়ে গরম ডুবো তেলে সবজি-মাংসের পাঁকোড়া ভাজতে ভাজতে হঠাৎ নিজের কথা ভাবছিল রেহনুমা। আজকাল প্রায়ই এমন হচ্ছে তার। অনেক কাজের ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে হঠাৎ আনমনা হয়ে পড়ছে। নিজের জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব খুঁজতে গিয়ে এক ধরনের হতাশার গ্লানি পেয়ে বসছে তাকে। ড্রইংরুমে গরম গরম পাকোড়ার জন্য অপেক্ষা করছে আরমান। সাথে রয়েছে নেহাল। একটু পরেই তারা দু’জন ব্যাংকে যাবে। অল্প কিছুদিন হলো আরমান ও নেহাল মিলে নতুন এক ব্যবসা শুরু করেছে। অনেকদিন থেকে ঠিকাদারিসহ টুকটাক নানা ধরনের ব্যবসা করছে আরমান। এ লাইনে তার অনেক অভিজ্ঞতা।
নেহালের সাথে আলাপ পরিচয় এক-দেড় বছরের। তার বয়স খুব বেশি নয়। ত্রিশ পেরিয়েছে দুই বছর আগে। এখনও ব্যাচেলর। ভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়েছে নিজেকে। বাবা দেশের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। পারিবারিক ব্যবসা থাকলেও নেহাল নিজের মত করে নতুন কিছু ব্যবসা দাঁড় করাতে চাইছে। সামাজিক প্রভাব, প্রতিপত্তি, দাপুটে অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সরকারি অফিস এবং ব্যাংকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পায় সে। যে কারণে নেহালকে বিজনেস পার্টনার করতে অনেকেই আগ্রহী। আরমানের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা তাকে আলাদাভাবে আকৃষ্ট করেছে। একদিন মতিঝিলে একটি বড় ব্যাংকের হেড অফিসে ম্যানেজিং ডিরেক্টরের চেম্বারে আলাপ পরিচয়ের পর থেকে নেহাল নিজের আগ্রহে আরমানের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে কম সময়ের মধ্যে। সেই প্রস্তাব দেয় নতুন ব্যবসা শুরুর। গত কয়েক মাসে অনেকটাই এগিয়েছে তারা। ব্যাংকে অনেকগুলো এলসি খোলা হয়েছে। হংকং, চীন এবং সিঙ্গাপুর থেকে নানা ধরনের পণ্য সামগ্রী আমদানি করছে তারা। এবার গাজিপুরে একটা ছোটখাটো ইন্ডাস্ট্রি চালুর পরিকল্পনা তাদের। ব্যাংক লোনের জন্য প্রপোজাল, বিজনেস প্রোফাইল তৈরি করেছে গত দশ-বারোদিনে। আজ সেগুলো ব্যাংকে জমা দিতে যাবে তারা।
যাবার আগে নেহালকে বউয়ের হাতে তৈরি গরম গরম স্পেশাল সবজি-মাংসের পাকোড়া আর চা খাওয়াবে আরমান। স্বামীর ইচ্ছে পূরণের কাজটি করছে রেহনুমা। তার হাতের পাকোড়া নাকি ওয়ার্ল্ডফেমাস-- আরমান সবার কাছে বড় গলায় বলে বেড়ায়। বিজনেস পার্টনার নেহালকে আজ সেই ওয়ার্ল্ডফেমাস স্পেশাল পাকোড়া না খাইয়ে ছাড়বেনা সে।
ছোট ভাইয়ের বয়সী নেহাল ছেলেটা বেশ হাসি-খুশি, স্মার্ট, প্রাণবন্ত স্বভাবের। ব্যবসায়িক আলোচনা ও কাজের সূত্রে আজকাল এ বাসায় ঘন ঘন যাতায়ত তার। রেহনুমা সব সময়ে নিজের হাতে তৈরি নানা ধরনের নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করে নেহালকে। অল্পদিনে ছেলেটা তার বেশ ভক্ত হয়ে গেছে। সে ই রেহনুমাকে তাদের নতুন ব্যবসায় একজন পার্টনার হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তার এমন প্রস্তাবে ভীষণ অবাক হয়েছে রেহনুমা। বিজনেস পার্টনার হওয়ার মত তার কাছে আলাদা পুঁজি মানে টাকা-পয়সা নেই। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের তেমন কোনো ধারণাও নেই। পড়াশোনা করেছে বোটানিতে। উদ্ভিদ, লতাপাতা গাছপালার বিষয় নিয়ে। ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং , ইকনমিক্স সাবজেক্ট নিয়ে পড়লে না হয় একটা কথা ছিল। তাছাড়া চাকরি-বাকরিও করেনি সে। চাকরি-বাকরি করলে, অফিস চালালে ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা আইডিয়া, জ্ঞান আপনা-আপনি চলে আসে একজন মানুষের মধ্যে। বিয়ের পর আরমানের সংসারের দায়িত্ব নিয়ে বাড়ির বাইরে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনি। রেহনুমা চাইলে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি উচ্চপদস্থ চাকরিতে ঢুকতে পারতো, নয়তো কোনো ব্যাংকে অথবা কর্পোরেট জীবনে। তার সাথে ভার্সিটির সহপাঠি ছেলে-মেয়েদের প্রায় সবাই এখন বেশ ভালো ভালো চাকরি-বাকরি করছে। তার নিজেরও ইচ্ছে ছিল। কিন্তু শাফিন পেটে আসার পর সেই ইচ্ছেটাকে চাপা দিয়েছিল কিছুদিনের জন্য। রেহনুমা ভেবেছিল, ছেলেটা একটু বড় হলেই চাকরি-বাকরি নিয়ে সিরিয়াস হবে।
আরমান বউয়ের মনের ইচ্ছের কথাটা জানতো। সে কোনোদিনই চায়নি রেহনুমা ঘরের বাইরে যাক, দশটা-পাঁচটা চাকরি জীবনে ঢুকে পড়–ক। ছেলেটাকে ঠিকভাবে বড় করে তোলা এবং ঘর-সংসার করার মধ্যে নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ,বিদ্যা-শিক্ষাকে কাজে লাগাক সেÑ তেমনটি চেয়েছে আরমান। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আকারে ইঙ্গিতে নয়, সরাসরি মুখ ফুটে সে নিজের চাওয়ার কথা বলেছে তার বউকে। ট্রাডিশনাল হাউজওয়াইফ মানে আটপৌরে গৃহবধু বলতে যা বোঝায়, তাই চেয়েছে সে।
শহরের ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করানো থেকে শুরু করে তাকে উন্নতমানের কোচিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া ,‘ও’ লেভেল ‘এ’ লেভেল এ ভালো গ্রেড নিয়ে পাশ করানো পর্যন্ত দীর্ঘযাত্রায় সব সময় নিজেকে ধরে রাখার পাশাপাশি ঘর-সংসার সামলানোর কাজ করতে গিয়ে চাকরি-বাকরির চিন্তা-ভাবনা কোন দিকে উবে গেছেÑ বুঝতেই পারেনি রেহনুমা। এখন তার বড় পরিচয় সে একজন হাউজওয়াইফ, ব্যবসায়ী আরমান আহমেদের বউ। ছেলে শাফিনের মা। ‘এ’ লেভেল পাশ করার পর দেশের একটি ভালো প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল ছেলেটা। কিছুদিনের মধ্যে সে অস্ট্রেলিয়ার একটি ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়। ফুল স্কলারশিপ নিয়েই সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে শাফিন।
একমাত্র সন্তান পাশে নেই, কাছে নেই। হাজার হাজার মাইল দূরে ভিনদেশে পড়ে আছে। ব্যাপারটা মনে হলেই বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে আসে। তীব্র এক হাহাকার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মনকে প্রবোধ দেয়। আজকালকার ছেলে-মেয়েরা আগের দিনের ছেলে-মেয়েদের মত নয়। নিজের ভবিষ্যত জীবন নিয়ে তাদের স্বপ্ন আকাঙ্খা অনেক ব্যাপক, বিস্তৃত। দেশের নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়না নিজেকে। তারা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজেদের নিয়ে যেতে চায় যেকোনো ভাবে। শাফিন যখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার জন্য ফুল স্কলারশিপ পায় সবাই খুব খুশি হলেও রেহনুমা মা হয়েও খুব খুশি হতে পারেনি। তার ইচ্ছে ছিল, ছেলেটা দেশে থেকেই লেখাপড়া করুক। নিজের কাছে, চোখের সামনে থাকবে সে। সব সময় সন্তানকে দেখবে, তার কাছাকাছি থাকতে পারবে। এর চেয়ে বড় সুখ, বেশি আনন্দের আর কী হতে পারে। সেই সুখ আর আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকলেও সব দুঃখ-বেদনা এখন বুকের মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে সে।
কিচেন থেকে গরম গরম ভাজা পাকোড়া আর চা নিয়ে ড্রইংরুমে রেহনুমা ঢুকতেই উচ্ছ্বসিত গলায় আরমান বলে, ‘এই তো এসে গেছে আমাদের সেই বিশ্ববিখ্যাত পাকোড়া, নেহাল, তোমার জন্য স্পেশালি বানিয়েছে তোমার ভাবি, একবার খেলেই বুঝবে। আর কিছু করতে পারুক বা না পারুক পাকোড়াটা দারুন করে সে। খেয়ে দেখোনা, ছোট ভাই।’
রেহনুমা পাকোড়ার প্লেট আরমান এবং নেহালের সামনে তুলে ধরে। প্লেট থেকে পাকোড়া তুলে নিতে নিতে নেহাল তাকায় তার দিকে। তার ঘর্মাক্ত, বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ভাবি, কে বলেছে আপনাকে এতো কষ্ট করে পাকোড়া ভেজে আনতে। আপনার সুন্দর মুখটার কী অবস্থা হয়েছে চুলার পাশে এতোক্ষণ ধরে থাকতে থাকতে। আমি এটা মেনে নিতে পারছিনা। এতো সুন্দর মুখটার কী অবস্থা হয়েছে দেখেন তো আরমান ভাই।
নেহালের কথায় কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায় রেহনুমা।
‘ধূর, কী যে বলো? আমি কী কিচেনে আজ প্রথম ঢুকলাম। বিয়ের পর থেকেই তো ঢুকেছি, ঘরের রান্নাবান্না সবই তো আমিই করি। এ আমার জন্য নতুন কোনো ব্যাপার নয়। আমার তো কিছু খারাপ লাগেনা। বরং এ কাজটা বেশ আনন্দ নিয়ে করি। বলতে পারো, এক্সটা চার্ম ফিল করি। আই এনজয় ইট ভেরি মাচ।’
কথাগুলো বলতে বলতে নিজের শাড়ির আঁচলে মুখের, ঘাড়ের, গলার ঘাম মুছে নেয় সে আলতো ভাবে। একপাশে সোফায় বসতে বসতে বলে, ‘তোমাদের পেপারস সব রেডি হয়ে গেছে? আজই তো ব্যাংকে জমা দিতে পারবে?
‘হুম রেডি, এখন শুধু বাকি আমাদের বিজনেসের একজন পার্টনারের সিগনেচার, তার সিগনেচার হয়ে গেলেই সব কাজ কমপ্লিট হয়ে যাবে, নেহাল পাকোড়া খেতে খেতে বলে।
রেহনুমা বুঝতে পারে তার কথাই বলছে সে। নতুন এই ব্যবসায় তাকে একজন পার্টনার রাখা হয়েছে। রেহনুমা নিজে কিংবা আরমান কেউ চায়নি ব্যাপারটা। নেহালের জোরাজুরিতে এবং বিশেষ আগ্রহে তাকে পার্টনার করা হয়েছে।
নিজের পার্টনার হওয়ার বিপক্ষে যুক্তি খাড়া করে রেহনুমা বার বার বলেছে, ‘আরে আমি তো তোমাদের ব্যবসায় কোনো টাকা-পয়সা ইনভেস্ট করছিনা, আমার কাছে আলাদাভাবে তেমন কোনো টাকা-পয়সাও নেই যে ইনভেস্ট করবো। আর ইনভেস্টমেন্ট ছাড়া কি বিজনেসে পার্টনার হওয়া যায়?
‘যায় , যায়। ভাবি, ইনভেস্টমেন্ট না করেও অনেক সময় বিজনেসে পার্টনার হওয়া যায়। এরকম হলে তাকে সিøপিং পার্টনার বলে। আপনি হলেন আমাদের নতুন এই ব্যবসায় সিøপিং পার্টনার। এখানে আপনার গুরুত্ব কোনোভাবেই কম নয়,
বলতে বলতে নেহাল একটি ফাইল আর কিছু কাগজপত্র নিয়ে এগিয়ে এসে রেহনুমার কাছে এসে পাশে বসে। সেগুলো এগিয়ে দিতে দিতে কোথায় সিগনেচার করতে হবে দেখিয়ে দিতে থাকে । তার হাতে একটি কলম ধরিয়ে দেয় নেহাল।
‘আরমান ভাই, ভাবিকে নতুন ব্যবসার ডিটেলস জানাবেন না? হাজার হোক, ভাবি তো আমাদের এই বিজনেসে একজন ডিস্টিংগুইসড পার্টনার। বিজনেসটার বিষয়ে তার তো ডিটেলস জানার অধিকার রয়েছে।’
‘আরে, রাখো তো। তোমার ভাবিকে আর কী বলতে হবে? শি ইজ জাস্ট এ সিøপিং পার্টনার। ওর এর চেয়ে আর বেশি কিছু জানার দরকার নেই। জানলেও কী করবে সে? কী করতে পারবে? তোমার ভাবীর কী কিছু করার ক্ষমতা বা সামর্থ্য আছে?’
আরমানের মুখে তেমন কথা শুনে নিজেকে আরো একবার ভীষণভাবে অপমানিত বোধ করে রেহনুমা। অনেক ছোট মনে হয় নিজেকে। বাইরের লোকজনের সামনে তাকে ছোট করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলা অপমান করাটা আরমানের মজ্জাগত অভ্যাস হয়ে গেছে। খুব খারাপ লাগলেও রেহনুমার কিছু করার নেই। নীরবে মুখ বুঁজে সব অপমান, লাঞ্চনা, গঞ্জনা সহ্য করা ছাড়া তার কিছুই করার নেই যেন। এটাই যেন তার নিয়তি।

আরমানের সংসারে আছে সে অনেকগুলো বছর ধরে। পুরো সংসারটা গুছিয়ে রাখছে নিপুণভাবে। এ কাজের জন্য কোনো বেতন ভাতা কিছুই পায়না রেহনুমা। যে পরিশ্রম, মেধা, শ্রম, ধৈর্য্য, চেষ্টা, সাধনা দিতে হচ্ছে তাকে তার বিনিময়ে আর্থিক মূল্য হিসেবে অনেক টাকা দাবি করতে পারে সে। সব পরিবারের গৃহবধুরা এরকম টাকা দাবি করতে পারে, যদি তারা চায়। অনেক সময় পারিবারিক আড্ডায় এ বিষয় নিয়ে কথা তুলে আসর গরম তোলে তার মতো অন্য অনেক মেয়ে। এ নিয়ে হাসি ঠাট্টা, মজাও হয়। এভাবেই হারিয়ে যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু।
ব্যাংক লোনের জন্য তৈরি বিভিন্ন ফাইল এবং অন্যান্য কাগজে একজন পার্টনার হিসেবে নিজের স্বাক্ষর দিতে দিতে দেহমনে এক ধরনের শিহরণ খেলে যায় রেহনুমার। হোক না সে একজন সিøপিং পার্টনার, তবুও তো তার একটা ভূমিকা রয়েছে নতুন এই ব্যবসায়। একজন অংশীদার হিসেবে নিশ্চয়ই তার কিছু কিছু অধিকার রয়েছে। যার স্বীকৃতি হলো বিভিন্ন ডুকমেন্টস এবং ফাইলে তার এই স্বাক্ষর। সারা শরীর অদ্ভুত শিহরণ কাঁটা দিয়ে ওঠে। নেহাল তার খুব কাছে শরীর ঘেষে বসে কাগজের পাতা উল্টে দিতে থাকে। ঘোরের মধ্যে সবগুলো কাগজে স্বাক্ষর দেয় রেহনুমা। নেহাল সোফায় তার একদম শরীর ঘেষে বসেছে, সেদিকে খেয়াল থাকেনা। স্বাক্ষর দেওয়া শেষ হলেও তার ঘোর যেন কাটতেই চায়না। এতোদিন স্রেফ একজন গৃহবধু হিসেবে ঘর-সংসারের নানা দায়িত্ব পালন ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ হয়নি। ঘরের চার দেয়ালের বাইরের জগতে তার অনেক কিছু না হলেও কিছু করার যোগ্যতা এবং ক্ষমতা রয়েছেÑ এটা আজ প্রমাণিত হলো।
হঠাৎ বিপরীত দিকের সোফায় বসে থাকা আরমানের দিকে চোখ পড়তেই সন্বিত ফিরে পায় যেন সে। অনেকটা অপ্রস্তুত, বিব্রতবোধ করে। চট করেই সে নেহালের কাছ থেকে সরে বসে বেশ কিছুটা দূরে। ব্যাপারটা দেখেও না দেখার ভান করে আরমান।
নেহাল ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য সবগুলো কাগজ এবং ফাইল ঠিকঠাক মত সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার পাশ থেকে রেহনুমা ভাবির হঠাৎ অপ্রস্তুত হয়ে দূরে সরে বসার ব্যাপারটা তেমন খেয়াল করেনা।

বিয়ের আগে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতো আরমান। অফিসে ভালো পজিশন, মাস শেষে অনেক বেতন। তেমন চাকরিজীবী পাত্রের কাছে মেয়ের বিয়ে দিতে পেরে বেশ খুশি হয়েছিলেন রেহনুমার বাবা-মা। আরমান দেখতে শুনতেও বেশ সুন্দর। সুঠামদেহী, স্মার্ট। ভার্সিটি থেকে পাস করেই চাকরি পেয়ে গেছে। রেহনুমাও বাবা-মায়ের পছন্দে আপত্তি করতে পারেনি। তখনও তার লেখাপড়া শেষ হয়নি। অনার্স শেষ করে মাস্টার্স করছিল। তার নিজের ইচ্ছে ছিল, পড়াশোনা শেষ করে নিজের মেধা ও যোগ্যতায় একটা চাকরি-বাকরি জুটিয়ে নিয়ে তারপর বিয়েশাদি করার চিন্তা-ভাবনা করবে। নিজের যোগ্যতায় আগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারপর মেয়েদের সংসার জীবনে ঢোকা উচিতÑ ভার্সিটিতে পড়ার সময় ভাবতো রেহনুমা। স্বামীর সংসারে স্রেফ হাউজওয়াইফের পরিচয়ে থাকলে নিজের অবস্থানটা তেমন শক্ত, জোরালো হয়না। স্বামীর ইচ্ছাতেই জীবনের সবকিছু নির্ধারিত হয় তার। তার নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার, চাওয়ার তেমন দাম থাকেনা। এসব নিয়ে কিছু বলতে গেলে স্বামীর বিরাগভাজন হতে হয়।
ঝগড়া-বিবাদ, পারিবারিক কলহ-সংঘাত লেগে থাকে। বাবা-মায়ের পছন্দের পাত্র আরমান আহমেদকে রেহনুমারও বেশ ভালো লেগে গিয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে নিজের যোগ্যতায় একটা চাকরি-বাকরি জুটিয়ে বিয়ে করার চিন্তা-ভাবনা মাথা থেকে সরিয়ে নতুন জীবনে পা রেখেছিল সে। গ্রামে বাড়ি হলেও বিয়ের পর বউকে নিয়ে ঢাকা শহরের ভালো জায়গায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে উঠেছিল আরমান । ছাত্রী থাকা অবস্থায় বিয়ে করলেও রেহনুমার ভার্সিটির পড়া শেষ করার ব্যাপারে আপত্তি করেনি তখন সে স্বামী হিসেবে ।
মাস্টার্স পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই রেহনুমার কোলজুড়ে এসেছিল ছেলে শাফিন।
যে আরমানকে দেখে তার ভদ্র স্মার্ট চলন-বলন দেখে কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল রেহনুমা বিয়ের পর এক ছাদের নিচে বসবাস করতে গিয়ে দিনে দিনে মানুষটিকে নতুনভাবে আবিস্কার করেছিল সে। বাইরে থেকে দেখা মানুষটির আসল রূপ ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতেই কষ্টে ,অপমানে, গ্লানিতে রেহনুমার বুকের ভেতরটা ক্রমেই ভারি হয়ে উঠেছিল। অল্প কিছুতে সন্তুষ্ট থাকা মেয়েটি সুন্দর ছিমছাম সাধারণ আটপৌরে জীবনযাপনে নিজের সুখ খুঁজে পেতে চাইলেও আরমানের উচ্চাকাক্সক্ষা, দ্রুত অনেক অর্থ-বিত্ত সম্পদ অর্জনের নেশা তাকে হাঁপিয়ে তুলেছিল। চাকরি-বাকরি করে বড় লোক হওয়া যাবেনা, চারপাশে বিজনেস করে, সরকারি চাকরি করে ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রাতারাতি গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদির মালিক হয়ে যাচ্ছে সবাইÑ যা সে করতে পারছেনা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। এ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাসায় ফিরে হইচই করতো, রেহনুমার সাথে দুর্ব্যবহার করতো।
শেষমেষ একদিন হঠাৎ করেই চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল আরমান ব্যবসা করে বড়লোক হওয়ার ধান্ধায়। এ ব্যাপারে রেহনুমার কোনো মতামত কিংবা পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। মানুষ সাধারণত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে খুব কাছের মানুষটির সাথে বুদ্ধি পরামর্শ করে, তার মতামত গ্রহণ করে। আরমান তার কোনো পরোয়া না করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ব্যাপারটা রেহনুমাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছিল। যে মানুষটির সঙ্গে সংসার জীবন শুরু করেছে মাত্র, সেই মানুষটি স্ত্রী হিসেবে, জীবনসঙ্গী হিসেবে কতটা গুরুত্ব দেয় তাকে ,কীভাবে মূল্যায়ন করে -- তার প্রমাণ পেয়ে বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠেছিল। এই মানুষটির সাথে সারাটি জীবন কাটাতে হবে তাকে ,ভেবে ভেবে আকুল হয়েছিল।
আসলে সময়ই হলো সব দুঃখ-কষ্ট, বেদনার সেরা নিরাময়কারী। আরমানের সাথে কুড়ি একুশ বছরের দাম্পত্য জীবনে তার কাছ থেকে লাঞ্চনা, অপমান, যন্ত্রণা আর শারীরিক মানসিক অতৃপ্তি-অশান্তি ছাড়া আর কিছু পায়নি রেহনুমা। প্রথম দিকে অনেক খারাপ লাগলেও একসময়ে এই জীবনের সাথে কোনোভাবে মানিয়ে নিয়েছে সে নিজেকে। ব্যবসা করতে নামলেও শুরুতে আরমানের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ পুঁজি ছিলনা। টাকা-পয়সার অভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার অবস্থা হয়েছিল। তখন নিজেই উদ্যোগী হয়ে বিয়ের সব গয়না দোকানে বিক্রি করে বেশ বড় অংকের টাকা স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিল রেহনুমা। মজার ব্যাপার হলো, তার দেয়া টাকাগুলো আরমানের ব্যবসায়িক উত্থানে সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছিল। সেই টাকায় ব্যবসা করে অল্পদিনেই দশগুণ পরিমাণ লাভ করেছিল। এভাবেই আরমানের ব্যবসায়িক পুঁজির শক্ত একটা ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। সেই থেকে দিনে দিনে তার ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক প্রসার হয়েছে। খ্যাতি, সুনাম প্রভাব বেড়েছে। ধানমন্ডিতে নিজের কেনা ফ্ল্যাটে উঠেছে, গাড়ি কিনেছে, ছেলেকে শহরের নামি দামি স্কুলে পড়িয়েছে, নিজের আলাদা অফিস খুলেছে।
এতোসব কিছুর মূলে রেহনুমার তুলে দেওয়া বিয়ের সব গয়না বিক্রির টাকাÑ একথা প্রথম প্রথম কিছুদিন বললেও আজকাল আর মুখে উচ্চারণ করেনা মানুষটা। সব সময় একটা দাম্ভিক ভাব দেখিয়ে উচ্চারণ করে, ‘আই অ্যাম এ সেলফ মেড ম্যান। আমি বড় লোক হয়েছি নিজের চেষ্টায়, পরিশ্রমে, অধ্যবসায়ে। আমার আজকের এ পর্যায়ে আসার জন্য আমার একক কৃতিত্বটাই হলো বড়।’
মায়ের দেয়া, শাশুড়ির দেয়া গয়নাগুলো তখন দোকানে বিক্রি করতে গিয়ে অনেক কষ্ট অনুভব করেছিল রেহনুমা। তাদের ভালোবাসা, স্নেহ আদরের চিহ্ন সাথে আর কিছুই রইলোনা। গয়নাগুলোকে জড়িয়ে ছিল অনেক মধুর স্মৃতি। আরমানের ব্যবসার পুঁজির জন্য সবই ত্যাগ করেছিল, বিসর্জন দিয়েছিল সে। যদিও এরপর আরমানের টাকায় নতুন নতুন ডিজাইনের অনেক গয়না করেছে। ডায়মন্ড, স্বর্ণের কয়েকটি অলঙ্কার সেট রয়েছে তার। কিন্তু সেগুলো পরার কোনো আকর্ষণ অনুভব করেনা রেহনুমা। সেগুলো সারা বছরই লকারে বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে থাকে। বিয়েশাদি, পার্টি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইমিটেশনের গয়না পরেই যায় সে। আজকাল বাজারে নিত্যনতুন ডিজাইনের ইমিটেশনের গয়না, অলঙ্কার পাওয়া যায়। এখন সেগুলোতেই ঝোঁক সব মেয়েদের।
ব্যবসা-বাণিজ্য করে দিনে দিনে বিত্তবৈভব সম্পদ বাড়িয়েছে আরমান। কিন্তু অর্থবিত্তের প্রতি ঝোঁক কমেনি তার। রেহনুমা গোটা সংসার একাই সামলে এতোদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আরমান শুধুমাত্র টাকা দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করেছে। কোথা থেকে কী হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছেÑ সে ব্যাপারে তেমন খোঁজ-খবর রাখেনি। ছেলেটা শহরের সেরা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে ও লেভেল, এ লেভেল কমপ্লিট করে ভার্সিটি পর্যন্ত পৌঁছেছে। শাফিন এখন অস্ট্রেলিয়ায় স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছে। ছেলেকে ঠিকভাবে গাইড করে এতোদূর পর্যন্ত নিয়ে আসার পেছনেও মা হিসেবে রেহনুমা একাই কৃতিত্বের দাবিদার। আরমান কোনো সময়ে শাফিনকে সেভাবে সময় দিতে পারেনি ব্যবসায়িক ব্যস্ততার অজুহাতে। চাইলে সে বাবা হিসেবে সন্তানের পাশে থেকে অনেকটাই গাইড করতে পারতো। কিন্তু রেহনুমার মতো দায়িত্বশীল বউ আছে যার, তার তো কোনো চিন্তা-ভাবনা থাকতে পারেনাÑ এমন ভাব নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে গত কুড়ি-একুশ বছর।
একমাত্র সন্তান শাফিনকে বড় করে তুলতে মা হিসেবে একাই ছুটোছুটি করতে হয়েছে রেহনুমাকে। সংসার সামলে ছেলেকে নিয়ে স্কুলে, কোচিংয়ে প্রাইভেট টিউটরের কাছে নিয়ে যাওয়ার কাজগুলো করেছে সে সুচারুভাবে । মাঝে মাঝে ক্লান্তিতে হাঁপিয়ে উঠলেও থেমে যায়নি। অবহেলায়, অনাদরে অযতেœ সন্তান যাতে নষ্ট হয়ে না যায়, যেন বিপথগামী না হয় সেদিকে নজর ছিল তার। শাফিনও তার মায়ের পরিশ্রম, নিষ্ঠা, একাগ্রতার মল্য দিয়েছে। সব সময় ভালো রেজাল্ট করে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে । ছেলের পড়াশোনার ব্যাপারে বাবা হিসেবে কোনো সময়ে তেমন সিরিয়াস মনোযোগ কিংবা খোঁজ-খবর না রাখলেও পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পর শাফিনের পিঠ চাপড়ে বাহবা দিয়ে বলেছে, ‘এই তো আমার বাপকা বেটা। বাপের মতো হয়েছিস। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হয়েছিস আমার মতো। স্কুল কলেজ ভার্সিটি সবখানেই আমি ছিলাম তুখোড় স্টুডেন্ট।
ছেলের ভালো রেজাল্টের পেছনে মা হিসেবে রেহনুমা যে প্রাণপাত করেছে, সংসার সামলে তাকে নিয়ে স্কুলে গেছে, কোচিং এবং প্রাইভেট টিউটরের কাছে অবিরাম ছুটোছুটি করেছে। বাসায় ফেরার পরও ছেলের লেখাপড়ার দিকে গভীর দৃষ্টি, মনোযোগ ছিল রেহনুমার।
শাফিন এখন ভালো রেজাল্ট করে বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে গেছে। ছেলেকে নিয়ে মা হিসেবে রেহনুমার অনেক গর্ব হলেও তার প্রত্যাশা ছিল, দেশেই থাকবে সে, এখানে থেকেই পড়াশোনা করবে। মায়ের কাছেই থাকবে শাফিন। ছেলেটি কাছে থাকলে তাকে দেখে মনের দুঃখ-বেদনা, অপ্রাপ্তি অতৃপ্তির কষ্টগুলো ভুলে যেতে পারবেÑ তেমন চিন্তা-ভাবনা মাথায় এলেও বাস্তবে তা হয়নি। শাফিন এখন হাজার হাজার মাইল দূরে ভিনদেশে রয়েছে। মাঝে মধ্যে ফোনে, মেসেঞ্জারে ভিডিও কলে কথা হয় ছেলের সাথে। গতকালও কথা হয়েছে শাফিনের সাথে। ছেলে বড় হয়েছে। মায়ের মনের গভীরে চেপে থাকা দুঃখ-বেদনা, কষ্টগুলো কিছুটা সে বুঝতে পারে হয়তো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে কী করতে পারে? ছেলের সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলেও তা আড়াল করে রেহনুমা।


কাজের বুয়া শেফালি ঘরের সব কাজ, ধোয়া-মোছা শেষ করে চলে যাবার পর নিজেও অনেকটা রিল্যাক্স বোধ করে রেহনুমা। ততক্ষণে তার রান্না-বান্নার পর্বও শেষ হয়ে যায়। শেফালি চলে যাবার পর বাসায় কাজ-কর্ম তেমন আর থাকেনা। আরমানও সারাটা দিন থাকেনা বাসায়। তার ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে যায়। অনেক সময় দুপুরে বাইরে লাঞ্চ সারে। যদিও কখনও দুপুরে বাসায় খায়, আগেভাগে বলে দেয়। কোনো সময়ে রাতেও বাইরে থেকে খেয়ে আসে মানুষটা। আরমানের সাথে দুপুরে একসঙ্গে বসে খাওয়া হয়না রেহনুমার প্রায়ই। যে কারণে ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্দিষ্ট সময়ে দুপুরে খেতে বসেনা। যখন মন চায়, তখন খায়। একাকী ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে ভালো লাগেনা।
শেফালি চলে গেলে বাথরুমে ঢোকে রেহনুমা। শাড়ি, ব্লাউজ, সব খুলে শাওয়ারের নিচে দাঁড়ায়। শাওয়ারের ঠা-া পানির ছোঁয়া শরীরের আলাদা শিহরণ জাগায়। সারা শরীরে সাবান মাখতে মাখতে দেয়ালে লাগানো লাইফ সাইজের আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকে সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। শাওয়ার পানিতে সাবানের ফেনা ধুয়ে মুছে গেলে নিজের শরীরটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আয়নায় নিজেকে দেখে তেমন চমকায় না। কোনো ভাবান্তর হয়না তার। রেহনুমা সাধারণত এভাবে সম্পূর্ণ নিরাবরণ হয়ে শাওয়ারের নিচে দাঁড়ায়না। আয়নায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুকের গভীর থেকে। এক ছেলের মা হয়েছে। সেই ছেলে বড়ও হয়েছে। বিদেশে পড়াশোনা করছে। আরমানের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে কুড়ি বছর আগে, ভার্সিটিতে পড়ার সময় ছাত্রী অবস্থায় সংসার জীবন শুরু করেছে। দেখতে দেখতে বয়সও বাড়ছে। দুই বছর আগেই চল্লিশ অতিক্রম করেছে। কিন্তু আয়নায় নিজেকে নিরাবরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় রেহনুমা। নাহ, সারা শরীরে বয়স বাড়ার কোনো ছাপ পড়েনি। কোথাও কোনো ভাজ নেই, কুঁচকানো ভাব নেই। বিদেশি সিনেমায় দেখা দুর্দান্ত যৌবনা নায়িকাদের মতো মনে হচ্ছে তাকে। অথচ আরমানের চোখে সে চরম হেলাফেলার পাত্রী। প্রায় সময় তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার। তার রূপ কিংবা শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে প্রশংসা কিংবা উচ্ছাস শোনা যায়না স্বামীর মুখে। বরং তার নানা মনোদৈহিক সমস্যা ও অক্ষমতা নিয়ে চরম বিরক্তি, অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য শুনতে হয়। আরমান প্রায়ই তাকে সাইকিয়াট্রিস্ট-এর যেতে বলে চিকিৎসার জন্য। বিয়ের পর থেকে কুড়ি বছরের দাম্পত্যজীবনে হাজার বার এরকম কটুকথা আর দুর্ব্যবহার রেহনুমাকে বিষিয়ে তুললেও মনের গভীরে একান্ত দুঃখ-বেদনা কষ্টগুলো লুকিয়ে রাখা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই তার। অসুখী দাম্পত্য জীবনের কথা বাইরে প্রকাশ করলে সংসারে অশান্তি বাড়বে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আরো বেশি দূরত্ব সৃষ্টি হবে। প্রতিকার তো কিছুই হবেনা ,বরং পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবেÑ এতোসব ভেবে নীরবে মুখ বুঁজে সব সয়ে গেছে দিনের পর দিন।
বুকের কাছে, পেটের নিচে কয়েক জায়গায় রক্তজমাট বেঁধে লাল হয়ে আছে। আয়নায় নিজের শরীরের দাগগুলো দেখতে দেখতে কান্না পায়। নিজেকে সম্বরণ করতে পারেনা। চোখের কোণ গড়িয়ে অশ্রু ঝরে ফোঁটায় ফোঁটায় নিজেই শরীরে পড়তে থাকে।
বাইরে থেকে দেখা হ্যান্ডসাম-সুপুরুষ , নিপাট ভদ্রলোক আরমানকে দেখে কেউ বলতে পারবেনা, রেহনুমার একান্ত জীবনে সে কতটা জঘন্য মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং কুৎসিত রুচির মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। রেহনুমার সাথে তার একান্ত মুহূর্তগুলো কতটা ভয়ঙ্কর ,যন্ত্রণাদায়ক, অসহ্য হয়ে ওঠে। জীবনসঙ্গীর কোনো গুন মানুষটির চোখে পড়েনা, তার মুখে স্ত্রীর কোনো কৃতিত্বের প্রশংসা শোনা যায় না। সব সময় তুমি এটা পারোনা’, ‘ওটা কেন করোনি, ‘তোমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা।’, আসলে তুমি একটা অপদার্থ মেয়ে মানুষ’Ñ এমন অপমানজনক মন্তব্য শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হয়েছে রেহনুমাকে। অথচ , তার মুখে সামিয়া ভাবি, লিজা আপা, নুসরাত আন্টিÑ এরকম অসংখ্য মহিলার উচ্ছসিত প্রশংসা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে তার। তাদের রূপের, গুণের, শারীরিক সৌন্দর্যের, সাজগোজ, পোশাক-আশাকের স্টাইলের উচ্ছসিত বর্ণনা লেগেই থাকে আরমানের মুখে। বিছানায় একান্তভাবে যখন স্বামীকে কামনা করে, নিজেকে তার ভালোবাসা আদরে ভাসিয়ে দিতে প্রস্তুত হয় তখন তার মুখে সেই সব নারীদের নাম উচ্চারিত হয়, তাদের কারো না কারো অশরীরি উপস্থিতি যে চরম অস্বস্তি হয়ে ওঠে, স্বতঃস্ফুর্তভাবে নিজেকে সঁপে দেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়Ñ এটা কোনোভাবেই আরমানকে বোঝাতে পারেনি রেহনুমা। এরকম বিকৃত মন-মানসিকতা রুচির প্রকাশের জন্য প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছে। কিন্তু তাতে কিছুই হয়নি। বরং অশ্লীল গালিগালাজ শুনতে হয়েছে।
কুড়ি বছরের দাম্পত্য জীবনে বউকে ঠিকমতো আদর করার কাজটা করতে পারেনি লোকটা। একজন নারীকে কীভাবে, কতোটা আনন্দ, সুখ এবং পরিতৃপ্তি দেওয়া যায় সেটা জানেনা সে। জানার চেষ্টাও করেনি কোনো সময়ে। নিজের মতো করে চড়াও হয়ে বন্য জন্তুর মতো আচরণ করে বিছানায়, তারপর একপাশে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়াটাকে সে তার রুটিন কাজ বলে মনে করে।
আজকাল আরমানের পাশবিকতা যেন বেড়েছে। কয়েকদিন আগে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল সে বন্য পশুর মতো, অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করে তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করায় তার বুকের কাছে, পেটের নিচে খামচে কামড়ে রক্তাক্ত করেছে। রেহনুমা আয়নায় নিজের শরীরের সেই ক্ষত চিহ্নগুলোর ওপর হাত বুলোয়। আবারও তার বুক চিরে গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।


রেহনুমা বাথরুম থেকে স্নান শেষে চমৎকার প্রিন্টের শাড়ি জড়িয়ে বেডরুমে এসে সুন্দর পরিপাটি করে পরে নেয় শাড়ি-ব্লাউজ। ভেজা চুলগুলো আর বাঁধেনা খোপায়, এলোচুলে আয়নায় নিজেকে দেখে। এখনও দুপুরের খাওয়ার সময় হয়নি। আরমান আজ দুপুরে বাসায় খাবেনা, বলে গেছে। বেশ কয়েক জায়গায় যেতে হবে জরুরি কিছু কাজ সারতে। বাইরে কোথাও লাঞ্চ সেরে নেবে সে অন্যান্য অনেক দিনের মতো।
বিছানায় আধশোয়া হয়ে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের একটি উপন্যাসের পাতায় চোখ রাখে রেহনুমা। এসময় বাসায় কোনো কাজকর্ম থাকেনা। অলস সময়টাতে গান শোনা, নয়তো গল্প-উপন্যাস, দৈনিক পত্রিকা পড়া ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা।
সুচিত্রা ভট্টাচার্যের প্রায় সবগুলো উপন্যাসই রেহনুমার পড়া। শুধুমাত্র ‘প্রেম-অপ্রেম’ বাকি ছিল। অনেক চেষ্টা করে নিউমার্কেটের এক বুকশপে খুঁজে পেয়ে সাথে সাথে কিনে এনেছে। অর্ধেকের মত পড়া হয়েছে। বেশ ভালো লাগছে। উপন্যাসের কাহিনীর মধ্যে ডুবে যেতে নিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, দুঃখ-কষ্ট, বেদনার কথা ভুলে যেতে চায় সে। ভালো লাগা প্রিয় কিছু গান মনের মধ্যে অন্যরকম আবেশ ছড়িয়ে দেয়। মন থেকে বঞ্চনা, কষ্টের গ্লানি, দুঃখবোধ মুছে দেয়। একটা ফুরফুরে তরতাজা আনন্দময় অনুভূতিতে ভরে যায় দেহমন। এখনও তেমন অবস্থায় রয়েছে রেহনুমা।
হঠাৎ কলবেলের শব্দে ছন্দপতন ঘটে যেন। এসময়ে আবার কে এলো? কাজের বুয়া শেফালি তো সব কাজ সেরে চলে গেছে। এখন তো আরমানের ফেরার কথা নয়। হঠাৎ ফিরলেও আগে-ভাগে জানাতো। কিছুটা দ্বিধা ছড়ায় মনে। হাতের বইটি বিছানায় রেখে দরজা খোলার জন্য এগিয়ে যায়। যেতে যেতে একটি জনপ্রিয় গানের করি গুণগুণ করে গাইতে থাকে। হঠাৎ করে কেন জানি মনটা এখন বেশ ভালো লাগছে। বেশ হালকা বোধ হচ্ছে নিজেকে।

(চলবে)

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top