বাজেটের সফল বাস্তবায়ন সমৃদ্ধ ভবিষ্যত নিশ্চিত করবে | বাজেট পরিক্রমা | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি

বাজেটের সফল বাস্তবায়ন সমৃদ্ধ ভবিষ্যত নিশ্চিত করবে

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত: ৬ জুন ২০২১ ১৫:২৮ আপডেট: ৭ জুন ২০২১ ১৯:০৫

রেজাউল করিম খোকন | প্রকাশিত: ৬ জুন ২০২১ ১৫:২৮

UCBL

অলংকরণ : রাজিব হাসান

২০২১-২২ অর্থবছরের নতুন বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা ছিল তার প্রতিফলন ঘটেনি পুরোপুরিভাবে। করোনাকালীন জীবন ও জীবিকার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও কার্যত নতুন বাজেটটি একটি গতানুগতিক বাজেটই হয়েছে। করোনার মধ্যে চলতি বছরের বাজেট বাস্তবায়নের ব্যর্থতার বিষয়টি আমলে না নিয়েই তৈরি করা হয়েছে আগামি অর্থ বছরের বাজেট প্রস্তাব। গতবছর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতা শেষ করেছিলেন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফির যাওয়ার আকাঙ্খা নিয়ে। তাঁর আশা ছিল, করোনা মহামারী থেকে শীঘ্রিই পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। উন্মোচিত হবে এক আলোকিত ভোরের। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। মহামারী থেকে পরিত্রাণ মেলেনি। দেখা হয়নি আলোকিত ভোর। অর্থনীতি এখনও গভীর সংকটে নিমজ্জিত । কাটেনি অনিশ্চয়তা। সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে, নতুন করে দরিদ্র হয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। এবারের প্রস্তাবিত নতুন অর্থবছরের বাজেটে এই সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতিফলন না ঘটায় হতাশ হয়েছেন প্রায় সবাই। ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার ব্যয় পরিকল্পনায় করোনার ক্ষতি মোকাবেলায় যে পরিমাণ আর্থিক বরাদ্দ এবং পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল তার যথাযথ প্রতিফলন নেই বাজেটে। কর্মসংস্থান একটি বড় বিষয় হলেও সেটি কম গুরুত্ব পেয়েছে। বরং আগের মতোই প্রণোদনার ফিরিস্তি রয়েছে। যে প্রণোদনার নামে গোষ্ঠী বিশেষ ব্যবসায়ীকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত গুরুত্বহীন থেকে গেছে। একইভাবে ক্রেতা স্বার্থ রক্ষায়ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘোষণা নেই। এটা উপলব্ধি করা দরকারÑ শুধু উৎপাদকদের আর্থিক সহায়তা দিলে হবেনাÑ বরং ক্রেতাদের হাতেও নগদ টাকার সংস্থান থাকতে হবে। ভোগব্যয় না বাড়ালেও ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপির প্রত্যাশাও পূরণ হবেনা।


নতুন অর্থবছর ২০২১-২২ এর বাজেট প্রস্তাবে খুশি হবেন ব্যবসায়ীরা। তাদের করপোরেট কর কমানো হয়েছে। সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে স্থানীয় শিল্পকে। কমেছে ব্যবসায়িক টার্ণওভার করহার। নানাভাবেই ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার আয়োজন রয়েছে এই বাজেটে। তবে এখানে সাধারণ মানুষের জন্য তেমন কোনো ছাড় নেই। এমনকি করোনা মহামারী এবং অর্থনৈতিক নানা সমীকরণে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন তাঁদের কথাও নেই বাজেটে। এই বাজেট প্রস্তাবে হতাশা হয়েছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সাধারণ মানুষের হাতে অর্থ দেওয়ার তেমন কোনো বন্দোবস্ত নেই। বিশ্বজুড়ে করোনাকালীন সময়ে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবার হাতেই নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের ভোক্তাশ্রেণী রয়ে গেছে উপেক্ষিত। ফলে ব্যবসায়ীরাও বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘পণ্য উৎপাদনে সহায়তা দিলেই হবেনা। বরং ঐ পণ্য কিনতে ক্রেতার হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকতে হবে।’ সেই নিশ্চয়তা যদি না থাকে, তাহলে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শুরুতেই সংশয় জাগাটাই স্বাভাবিক।
আমরা বর্তমানে চরম এক দুঃসময়ের মধ্যে দিন পার করছি। আমরা এখনও কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে আছি। আমাদের জীবন-জীবিকা, ও অর্থনীতির এতটা ক্ষতি এত বছরে কেউ করতে পারেনি, যতটা করেছে কোভিড-১৯ মহামারী। এ কারণেই বাজেটও হওয়া উচিত ছিল কোভিড মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে পর্যায়ক্রমে করোনার টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায়। চলতি অর্থবছরের মতো আগামি অর্থবছরেও করোনা মোকাবিলায় জরুরি চাহিদা মেটাতে পুনরায় ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখার কথা বলেছেন তিনি। তিনি অবশ্য চলতি অর্থবছরের ১০ হাজার কোটি টাকা কোথায়, কীভাবে খরচ হয়েছে তা ব্যাখ্যা করেননি। এবারের বাজেটে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রতিফলন ঘটেনি। মোট কথা, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বিবেচনায় নিয়ে এই বাজেট করা হয়নি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো প্রায় দেড় বছর ধরে বাংলাদেশ করোনা মহামারীর কবলে বিপর্যস্ত। এই সময়ে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের নানা ত্রুটি বিচ্যুতি, দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। তেমন বাস্তবতায় বিভিন্ন গবেষক, বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ও যৌক্তিকভাবে খাতওয়ারি বরাদ্দ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তার আলোকে কিছু করা হয়নি নতুন বাজেটে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ১২ শতাংশ বাড়লেও এখাতে পরিবর্তন আনার জন্য কিংবা সংস্কারের লক্ষ্যে যা প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি।


সরকারের পক্ষ থেকে এবারের বাজেটকে উন্নয়ন বান্ধব বলা হয়েছে। জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে দেশের সব মানুষের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাসহ একটি বাস্তবভিত্তিক সংকটকালীন সময়োপযোগী বাজেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধী দলগুলো প্রস্তাবিত বাজেটকে কল্পনাপ্রসুত, মনগড়া এবং আবাস্তব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, তাদের বক্তব্য হলো, আন্দাজে করা এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। ঘোষিত বাজেটে অপচয়, অব্যবস্থাপনা বন্ধ করে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ হয়নি। তাদের সবার দাবি, এই বাজেট ব্যাপকভাবে সংশোধন ও রদবদল করতে হবে। এবারের বাজেট কেবল বার্ষিক হিসাব কিতাবের বাজেট হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। বাজেট হওয়া উচিত ছিল ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কোন অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে নির্ধারিত পথ ধরে এগিয়ে যাবে এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধার করবে।

দেশে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত কালো টাকা সাদা করার প্রবণতা রোধ করার জোর দাবি থাকলেও প্রতিবার বাজেটে কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ করে দেওয়া হয়। তবে আগামি ২০২১-২২ অর্থবছরে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছেনা। ১০ শতাংশ কর দিয়ে নগদ টাকা ও ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা শেয়ারবাজারও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সাদা করা যাবেনা


আগামি অর্থবছরের নতুন বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে- ‘জীবন-জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামির পথে বাংলাদেশ।’ অর্থাৎ জীবন বাঁচাতে হবে, রক্ষা করতে হবে জীবিকাকেও। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যের কথা বলেছেন। পৃথিবী থেকে করোনা মহামারী সহজে বিদায় নিচ্ছেনা তেমন প্রেক্ষাপটে একমাত্র টিকার সঠিক ও ব্যাপক প্রয়োগের মাধ্যমে কিছু কিছু দেশ সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে। শুরুতে টিকা প্রাপ্তি এবং সহজলভ্যতা নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা না থাকলেও বাংলাদেশ পরবর্তীতে টিকা পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। এখন অনেক দৌঁড় ঝাঁপ করেও প্রয়োজনীয় এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা মস্তবড় চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে আমাদের জন্য। যে হারে বর্তমানে করোনা টিকা পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে, কতদিনে পূরণ করা সম্ভব হবেÑ সেটাই এখন সবার মনে বিরাট প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
প্রস্তাবিত নতুন অর্থবছরের বাজেটে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার রূপরেখা থাকার বিষয়টি ভালো লেগেছে অনেকেরই। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য উৎপাদনে কর ছাড় দেওয়ার উদ্যোগটি প্রশংসনীয় বলা যায়। বাজেটে করপোরেট কর হার কমানোর ঘোষণার পাশাপাশি দেশীয়ভাবে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে নানা প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের জন্য একধরনের স্বস্তি বয়ে এনেছে। এতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে সন্দেহ নেই। তবে লাভ-লোকসান নির্বিশেষে ন্যুনতম করের যে বিধান, তাতে অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কারণ, করোনা মহামারীর প্রভাবে অনেকেই ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি তেমন সুস্পষ্ট নয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষজন উপেক্ষিত রয়ে গেছে। পর্যটন খাত করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাজেটে কিছু পায়নি। কর্মসংস্থানের নতুন পদক্ষেপ নেই এবারের বাজেটে। সামাজিক নিরাপত্তার বেশিরভাগ কর্মসূচিতে মাথাপিছু বরাদ্দ যেমন বাড়েনি, তেমনি নতুন দরিদ্র ও শহরের দরিদ্রদের জন্য কর্মসূচি নেই। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট পণ্য ও বিনিয়োগে কর অব্যাহতি ও হ্রাস করার বিষয়টি প্রশংসা পেয়েছে সবার। করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিল্পখাতে যা যা দরকার, সবই দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হলেও বঞ্চিতদের মধ্য থেকে হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যক্তি আয়ের করমুক্ত সীমা তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা করা হলে ভালো হতো। এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্ণওভার এর ওপর কর ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বেশ গঠনমূলক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে অতি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি। সবার প্রত্যাশা ছিল, নতুন বাজেটে তাদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা দেখা যায়নি। ফলে তাদের হতাশ হতেই হয়েছে। মধ্যবিত্তরা করোনায় বেশি বিপর্যস্ত হলেও এই বাজেটে তাদের জন্য তেমন কিছু নেই। করপোরেট কর কমানোর ঘোষণায় উৎপাদনশীল খাতের কোম্পানির আয় বাড়বে সন্দেহ নেই। এতে করে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন কোম্পানির ইপিএস ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর করারোপ করার ফলে তার বোঝা সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে। নতুন বাজেটটি নারীবান্ধব হিসেবে অনেকটাই প্রশংসা পেতে পারে। কারণ, এই বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অনেক সুখবর রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের কোনো নারী উদ্যোক্তার বার্ষিক লেনদেন যদি ৭০ লাখ টাকার কম হয়, তাহলে তাকে কোনো কর দিতে হবেনা। বর্তমানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বার্ষিক ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনে কোনো কর দিতে হয় না। বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এতদিন আলাদা কোনো কর অব্যাহতি ছিলনা। পুরুষ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসা করতে হতো। তাই আগামি অর্থবছরের নতুন বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতেই নতুন এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এতদিন বার্ষিক টার্ণওভারের ভিত্তিতে পুরুষ উদ্যোক্তাদের সমান কর দিতে হতো তাঁদের। এবারের বাজেটে করের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বর্ধিত কর কোথা থেকে আদায় হবে, তা বলা হয়নি। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ, তারা অনেকটা মাথা খাটিয়েছেন। তবে সরকারি ব্যয় কার্যকরভাবে বৃদ্ধি এবং তার গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সেটা করা হয়নি। অথচ সরকারি ব্যয় থেকে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা কিছুটা লাভবান হয়ে থাকেন। বড়, সংগঠিত, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে পায়নি।


করোনা মহামারীতে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর বেশি মনোযোগি হতে সরকারের প্রতি তাগিদ ছিল বিভিন্ন মহলের। অবশেষে জিডিপির লক্ষামাত্রায় লাগাম টানলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি ২০২১-২২ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এই হার বর্তমান অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২০-২১ এ ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশে চাল, ডাল, তেলসহ সবজির বাজার মাঝে মধ্যে চোখ রাঙালেও কয়েকবছর ধরেই নিত্যপণ্যের দাম সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২১-২২ অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশে সীমিত রাখতে চায় সরকার। বর্তমান অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত এপ্রিলে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। করোনা মহামারীতে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ঘাটতি বাজেট আরো বড় করার আভাষ আগে থেকেই দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির তুলনায় ঘাটতি বাজেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশে। চলতি অর্থবছরে ঘাটতি বাজেট ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। আগের রেকর্ড ভেঙ্গেছে ঘাটতি বাজেটÑ একথা বলা যায়। বিদেশি ঋণ, ব্যাংক থেকে ধার গ্রহণ ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার এই ঘাটতি পূরণ করবে।
দেশে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত কালো টাকা সাদা করার প্রবণতা রোধ করার জোর দাবি থাকলেও প্রতিবার বাজেটে কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ করে দেওয়া হয়। তবে আগামি ২০২১-২২ অর্থবছরে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছেনা। ১০ শতাংশ কর দিয়ে নগদ টাকা ও ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা শেয়ারবাজারও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সাদা করা যাবেনা। গতবছর অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যে পড়েছিলেন। মূলত, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলে সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় আচরণ করা হয়। আমরা সচেতন নাগরিক হিসেবে এমন সুযোগ আর দেখতে চাইনা।
বাংলাশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ৫০ তম বাজেট ঘোষিত হলো। করোনা মহামারীতেও আয়করে কোনো ছাড় পাননি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। বছরে তিন লাখ টাকার বেশি আয় করলেই কর দিতে হবে। আর সর্বনিম্ন কর হার হচ্ছে ৫ শতাংশ। নতুন বাজেটের প্রভাবে দেশে শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাবে। কারন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আয়ের ১৫ শতাংশ হারে কর থাকলেও আইনি জটিলতার কারণে তা এতদিন কার্যকর করা যায়নি। তবে সেটিকে অর্থ আইনের মাধ্যমে কার্যকর করেছেন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাবিত বাজেটে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর আগেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ১২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। যা আগামি জুলাই মাস থেকে কার্যকর হবে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। এবারের বাজেটে কৃষকদের জন্য বেশ কিছু সুখবর রয়েছে। মুরগি, মাছ ও গবাদিপশুর খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ ্আমদানিতে কাঁচামালে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতিতে কর ছাড়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে দেশে কৃষি কাজে যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়বে। কৃষিযান্ত্রিকীকরণে এটা অনুকূল প্রভাব ফেলবে সন্দেহ নেই। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবারের নতুন বাজেটে। এতে নারীরা তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে কিছুটা হলেও ছাড় পাবেন।
এবারের ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অনেক কথাই বলেছেন। পুরো বক্তৃতা পড়লে দেশের ইতিহাসে হয়তো দীর্ঘতম বক্তৃতার স্বীকৃতি পেতে পারতেন তিনি। তাঁর এই বাজেট বক্তৃতায় দারিদ্র হারসহ অনেক তথ্য উপাত্তের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই, অনেক উপাত্তের হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই, কর্মসংস্থান নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণাও নেই প্রস্তাবিত বাজেটে তবে এবারের বরাদ্দ প্রস্তাবগুলো আগের বারের চেয়েও বাস্তবসম্মত হয়েছে। বিরাট অর্থনীতির তুলনায় এবারের বাজেটকে ছোট বলা যায়। এমনকি জিডিপির বিবেচনায় ১৯৭২ সালের চেয়েও ছোট। এবারের বাজেট যেমন জিডিপির ১৭ শতাংশের বেশি, যদিও তা অর্জিত হবে ১৫ শতাংশের মতো। অর্থনৈতিক ইতিহাস বলে, উন্নয়নের সঙ্গে জাতীয় আয় না বাড়লে বাজেটের আকার বাড়তে পারেনা। আমাদের কর-জিডিপির অনুপাত এখনও ৮ শতাংশের ঘরে।


বাজেট নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ সব সময়ই একধরনের আশার মধ্যে থাকেন। তাদের প্রত্যাশা থাকে বাজেটে ভাগ্য পরিবর্তনের দিক নিদের্শনা থাকবে। হয়তো বাজেটে অনেক ভালো ভালো উচ্চাভিলাসী পরিকল্পনা, ঘোষণা, পদক্ষেপ গ্রহণের কথা থাকে। যা দেখে শুনে সবাই আশায় আবার বুক বাঁধে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় জোর গলায় বলেছেন, ‘আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে দেশের মানুষ।’ দেশের মানুষ অকাতরে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছেন, সমৃদ্ধ ভবিষ্যত গড়তে অবদান রাখছেন, দেশের অর্থনীতিকে সচল ও শক্তিশালী করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। আগামি অর্থবছরের বাজেটে অনেক ভালো দিক যেমন রয়েছে, তেমনি দুর্বল দিকও রয়েছে। আমরা অহেতুক, অনর্থক সমালোচনা করার পক্ষপাতি নই। একটি জনবান্ধব, ব্যবসা বান্ধব, মহামারী দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম বাজেট হিসেবে দেখতে চাই এবারের বাজেটকে। আগামি অর্থবছরের বাজেট সফল বাস্তবায়নের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আমরা নৈরাশ্যবাদী হতে চাই না, অনেক আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করতে চাই। দেশের সব শ্রেণী, পেশা, ধর্ম-বর্ণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের ঐকান্তিক সহযোগিতায় এগিয়ে যাক বাংলাদেশ। সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হোক। অভাব দারিদ্র, দুঃখ-দুর্দশা; সমস্যা-সংকট কেটে গিয়ে নতুন নতুন সম্ভাবনায় উদ্ভাসিত হোক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশÑ তেমন প্রত্যাশা আমাদের সবার। অপচয়, অদক্ষতা, দুর্ণীতি, লুটপাট, অনিয়ম, অস্বচ্ছতা প্রভৃতি দূর করে সঠিকভাবে বাজেট বাস্তবায়নই সোনালী ভবিষ্যত এনে দিতে পারে আমাদের সামনে। বাজেটের সফল বাস্তবায়ন সমৃদ্ধ সোনালী ভবিষ্যত এনে দিতে পারে আমাদের সামনে। তাই সবাইকে বাজেটের সফল বাস্তবায়নে আন্তরিক এবং সহযোগী মনোভাবের পরিচয় দিতে হবে।

লেখক : সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top