করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় বড় ঘাটতির বাজেট | বাজেট পরিক্রমা | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮
বাজেট পরিক্রমা

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় বড় ঘাটতির বাজেট

ড. মাহফুজ কবীর

প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২১ ১৮:৪৪ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৫:৫৭

ড. মাহফুজ কবীর | প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২১ ১৮:৪৪


অলংকরণ : রাজিব হাসান

এবারের বাজেট এসেছে এমন একটি সময়ে যখন পুরো দেশ করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আক্রান্ত ব্যক্তি সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে প্রাণহানি। করোনা ভারতীয় বা ডেল্টা ধরন ছড়িয়ে পরিস্থিতি মারাত্মক হওয়ার আশংকাও বাড়ছে। অন্যদিকে, লকডাউনের কারণে অর্থনেতিক ক্ষতিও কম নয়। ব্যবসায়-বাণিজ্য ও জীবিকার সংগ্রামে অনেক মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। অনেকেই আবার শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ঘুরেও দাঁড়াচ্ছেন। আশায় বুক বাঁধছেন। বেকারত্ব বাড়ছে। অনেকে আবার ই-কমার্স, এফ-কমার্সের মধ্যে দিয়ে আত্ম কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছেন। নিজের ভাগ্য বদলে দিচ্ছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্যাকেজের বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যাংকগুলো অনেকটাই চাপের মধ্যে আছে। অন্যদিকে, প্রণোদনা তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে বড় শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য টিকে গেলেও অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো এ তহবিল থেকে যথাযথ সুবিধা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ আসছে অনেক। সব মিলিয়ে একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ে করোনার ভয়াবহ এক ঝুঁকি মোকাবেলায় এবং অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর একটি দৃঢ় প্রত্যয় উচ্চারিত হয়েছে প্রস্তাবিত ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে।

এ বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিরাট আকারের ঘাটতি। এটি প্রস্তাবিত বাজেটের জিডিপির ৬.২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এমন একটি বড় ঘাটতির প্রায় অর্ধেক অর্থায়ন করা হবে বিদেশী উৎস থেকে ঋণ ও অনুদান সংগ্রহের মাধ্যমে। বাকি অর্থের বেশিরভাগ আসবে দেশীয় ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ হিসেবে, আর বাকি অর্থ সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন এতো বড় ঘাটতি বাজেটের প্রয়োজন ছিল কিনা। আমার মতে, করোনা মহামারী মোকাবেলা করে অর্থনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য আর জীবন জীবিকার স্বার্থে বড় আকারের ঘাটতি এ বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯-এ ঘাটতিকে একটি সহনীয় সীমার মধ্যে রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু সীমাটা কতটুকু হবে সে অঙ্ক নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। তাই গতানুগতির ধারার বাইরে গিয়ে জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি পুরুদ্ধারের স্বার্থে কেইনসীয় ধারায় কিছুটা বেশি ঘাটতি রাখলেও তা ক্ষতিকর নয়, বরং অর্থনীতিকে মন্দার হাত থেকে বাঁচানো আর একটা শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয়।

প্রস্তাবিত বাজেটে একটি বড় আকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রকল্পে ১১২টি উপজেলায় উপযুক্ত জনগোষ্টির সবাইকে প্রকল্পের সুবিধাভোগী রাখা হবে, যা অত্যন্ত ভালো একটি দিক। আর সুবিধাভোগীর আওতা ও অর্থের পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। করোনা মহাকারীর এই দুঃসময়ে দরিদ্র, প্রান্তিক ও অসহায় জনগোষ্ঠীকে এ অর্থ কিছুটা স্বস্তি দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনীর সবচাইতে বড় শুভঙ্করের ফাঁকি হল এতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ও আনুতোষিকের জন্য। তার মানে, মোটের ওপর বড় অঙ্কের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হলেও আসলে এর দুই-তৃতীয়াংশ দরিদ্র আর অসহায় মানুষের জন্য। আবার এই অর্থের মধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আর অবকাঠামো উন্নয়নে। তাই সরাসরি অর্থ, খাদ্য ও বৈষয়িক সহায়তার বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ আরো কম। অন্যদিকে, করোনা মহামারীর সময়টাকে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠনিক খাতে নিয়োজিত নি¤œ আয়ের মানুষ অনেকটা খাদ্য সংকটে আছেন। তাদের অনেকে নিয়মিত বেতন ও মজুরি পাচ্ছেন না। তাই তাদের জন্য স্বল্পমূল্যে ‘খাদ্য প্যাকেজ’ বা রেশনিং-এর ব্যবস্থা করা যেতে পারতো। এতে করে ওই পরিবারগুলোর নারী ও শিশুরা পুষ্টিহীনতা থেকে মুক্তি পেতে পারতেন।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল আর রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ যোগাযোগ অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে যাতে এগুলো বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ না হয়। এছাড়া করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধিও অর্জনের স্বার্থেও প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে গ্রামীণ, জেলা ও আঞ্চলিক পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর এগুলো বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও অপচয়ের অভিযোগ অনেক পুরনো। প্রকল্প চিহ্নিতকরণ, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং-এ জনগণের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ না থাকার কারণে অনেকক্ষেত্রে দুর্নীতি আর অপচয়ের সুযোগ থেকে যায়। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হন মূলত করদাতাগণ। জনগণের অর্থের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের ভাবমূর্তিও।

করোনার এই মহাদুর্যোগে শিক্ষাখাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থীও স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। বাল্য বিবাহ হচ্ছে অনেক মেয়ের। শহরের তুলনায় গ্রামে আর দুর্গম অঞ্চলসমূহের (চর, হাওড় ও পাহাড়ি অঞ্চল) শিক্ষার্থীদের ক্ষতি অনেক বেশি। ইন্টারনেট সুবিধা না থাকার কারণে গ্রাম আর দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষার সুবিধা থেকে অনেকটা বঞ্চিত হচ্ছেন। দরিদ্র আর অসহায় পরিবারের শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরো শোচনীয়। এরকম দুরবস্থার কারণে দেশে কাঙ্খিত মানবপুঁজি বিনির্মাণে বেশ খানিকটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ও মানব উন্নয়নে একটি নেতিবাচক ধারা তৈরি হবে সন্দেহ নেই। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা ডিজিটাল শিক্ষার একটি বড় বাজেট ও বিশেষ কর্মসূচি আশা করেছিলাম। বাস্তবে তা দেখা যায়নি।

করোনা মহামারীর শুরু থেকেই স্বাস্থ্যখাতের ভঙ্গুর আর বেহাল দশা উন্মোচিত হয়েছে। এ খাতের সুশাসনের প্রশ্ন চলে এসেছে সবার সামনে। বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের চাকচিক্য ও ছড়াছড়ি থাকলেও করোনা মহামারী মোকাবেলায় তারা যে ঠুটো জগন্নাথ তা ইতোমধ্যে সবাই বুঝতে পেরেছেন। এরই মধ্যে শাহেদ-সাবরিনাদের র্কীর্তির কারণে এ খাতের স্বচ্ছতা আর জবাবদিহির দুর্বলতাও প্রতীয়মান হয়েছে। তবে সরকার ধীরে হলেও পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। আইসিইউ, জরুরী স্বাস্থ্যসেবা আর অক্সিজেনের সংকটও দূর হচ্ছে, কিন্তু তা মূলত সরকারি পর্যায়ে। বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত এখনো মুনাফাকেন্দ্রিক। দু’একটি সামাজিক উদ্যোগ ছাড়া জনকল্যাণ আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসা সেবার দ্বার তারা উন্মুক্ত করেনি। টিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন গুনছে সরকার। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য খাতে বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের প্রায় সমান আকারের স্বাস্থ্য বাজেট রাখা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বিদায়ী অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে করোনা মোকাবেলায় হিমশিম খেয়েছে সরকার। আগামী অর্থবছরে যদি একই রকম বরাদ্দ রাখা হয় তাহলে অবকাঠামোসহ ব্যাপক আকারের সেবার সুবিধা কিভাবে জনসাধারণের মাঝে পৌঁছানো যাবে? এছাড়া, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার কথা বলেছেন। বাজেটে তার সঠিক প্রতিফলন দেখা যায়নি।

এ বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিরাট আকারের ঘাটতি। এটি প্রস্তাবিত বাজেটের জিডিপির ৬.২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এমন একটি বড় ঘাটতির প্রায় অর্ধেক অর্থায়ন করা হবে বিদেশী উৎস থেকে ঋণ ও অনুদান সংগ্রহের মাধ্যমে। বাকি অর্থের বেশিরভাগ আসবে দেশীয় ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ হিসেবে, আর বাকি অর্থ সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে

 

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অনেকটা আশা করে ছিলেন এ বাজেটের জন্য, যাতে তারা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেন। করোনায় ইতোমধ্যে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়েছেন। এখাতে নিয়োজিত হাজার হাজার কর্মী কাজ হারিয়েছেন। আর ব্যাংকগুলোও প্রণোদনার অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে এসএমই খাতকে প্রাধান্য দেয়নি। ব্যাংকগুলোর সাথে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সু-সম্পর্ক না থাকার কারণে তারা বড় উদ্যোক্তাদের থেকে অনেকখানি পিছিয়ে রয়েছেন ব্যাংক থেকে ঋণ পাবার ক্ষেত্রে। প্রস্তাবিত বাজেটে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এসএমই নীতিমালা সংশোধন করা না গেলে এ তহবিল বাস্তবায়নে সরকারকে অনেকটা বেগ পেতে হবে। অবশ্য নারী উদ্যোক্তাদের কর্পোরেট করমুক্ত আয়ের সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ করা হয়েছে, যা একটি ভালো প্রস্তাব। কিন্তু শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী যাতে উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারেন সেজন্য বাজেট বিশেষ তহবিল তৈরির দরকার ছিল। এতে করে তাদের মধ্যে অনেকেই স্ব-কর্মসংস্থানের জন্য চেষ্টা করতে পারতেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে তামাক কর সবাইকে হতাশ করেছে। উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম সামান্য বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও নি¤œ ও মধ্যম স্তরের সিগারে্েটর দাম বাড়েনি যার ভোক্তা প্রায় ৮০ শতাংশ। উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম ১০ শলাকার প্যাকেটে বাড়ানো হয়েছে যথাক্রমে ৫ ও ৭ টাকা যা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির তুলনায় খুবই সামান্য। এছাড়া বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্যের ওপর কর জনগণকে তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করবে না। এতে করে তামাক ব্যবহার জনিতকারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। বাড়বে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতিও।

প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু ভালো বরাদ্দ ও নীতিগত প্রস্তাবের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা করোনা মহামারীর ঝুঁকি মোকাবেলা ও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসন ও সংস্কারের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়াও জরুরী। আশা করি বাজেট চূড়ান্ত করার আগে মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ বিষয়গুলোতে নজর দেবেন। তা না হলে বাজেটে শুধু টাকা খরচই হবে। অর্থ ব্যয়ের গুণগত মান ও সামাজিক উপকারের বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।


ড. মাহফুজ কবীর, গবেষণা পরিচালক
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top