মহামারির মন্দা উত্তরণে সহায়ক হতে পারে অপার সম্ভাবনাময় সমুদ্র খাত | বিজনেস | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮
বিজনেস

মহামারির মন্দা উত্তরণে সহায়ক হতে পারে অপার সম্ভাবনাময় সমুদ্র খাত

রেজাউল করিম খোকন,অতিথি লেখক

প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২১ ১৫:০৮ আপডেট: ২২ জুন ২০২১ ১৫:২১

রেজাউল করিম খোকন,অতিথি লেখক | প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২১ ১৫:০৮


ফাইল ছবি

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মোতাবেক, বিশ্বের ধনী দেশগুলোর ৯০ ভাগই ২০২২ সাল নাগাদ মহামারির পূর্বের অর্থনৈতিক অবস্থায় ফিরে যাবে। পর্যাপ্ত টিকা প্রাপ্তির কারণে ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি এত বেশি দ্রুত বেড়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে নিম্নআয়ের দেশগুলোর উত্তরণের গতি অনেক ধীর। ফলে মহামারি পরবর্তী বিশ্বে ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য অনেক বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্যে সমুদ্র সম্পদ আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে ওঠায় সহায়ক। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সমুদ্র সম্পদ আহরণের প্রতি জোর দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন।এখনও বাংলাদেশের জিডিপির মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ ব্লু ইকোনমি থেকে আসে। এটার পরিমাণ বার্ষিক ৯৬০ কোটি ডলার। তবে এই খাত থেকে আয়ের সম্ভাবনা অবারিত। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো আয় হয়। সমুদ্রের শুধু মাছ রপ্তানি থেকেই ১০-১২ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। অনেকে সমুদ্র অর্থনীতি সম্পর্কে খুব ভালো জানেন না। তারা বিনিয়োগ করতে চান না।

 

আবার কেউ কেউ মনে করেন, রাষ্ট্রীয় পলিসি এ খাতে বিনিয়োগে সহায়ক নয়। সমুদ্র-যোগাযোগ পথ ও সমুদ্র পরিবহণ, মৎস্য সম্পদ, খনিজ সম্পদ, জ্বালানি নিরাপত্তা, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙা শিল্প, দক্ষ জনবল সরবরাহ, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণ করে সমুদ্র সম্পদ আহরণ করা যায়। ব্লু ইকোনমি থেকে বিপুল আয়ের অপার সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু কাজে লাগানো যাচ্ছে খুব সামান্য। সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হওয়ার পর বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশ বছরে ৯৬০ কোটি ডলারের সম্পদ আহরণ করছে। যদিও সম্ভাবনা আকাশচুম্বী। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে বছরে আড়াই লাখ কোটি ডলারের সম্পদ আহরণ সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমুদ্র সম্পদ আহরণে সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে বিপুল সম্ভাবনা হাতছাড়া হচ্ছে। বিশেষ করে সমুদ্র খাতে বিনিয়োগ সীমিত। সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হওয়ার প্রায় ৭ বছর পরও সমুদ্র সম্পদ আহরণে তেমন অগ্রগতি হয়নি। ছিটেফোঁটা কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার বাস্তবায়নের গতি খুবই ধীর। কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে সমুদ্র সম্পদ আহরণে সব উদ্যোগ বলতে গেলে থেমে গেছে।
বঙ্গোপসাগর আমাদের অর্থনীতির জন্য অনেক সম্ভাবনার আধার হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে নীল সমুদ্র। অতি সম্প্রতি মূল্যবান খনিজ সম্পদ ইউরনিয়াম ও থোরিয়াম এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বাংলাদেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রের তলদেশে। জানা যায় ১৩টি জায়গায় আছে সোনার চেয়ে দামি বালি। যাতে মিশে আছে ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমানাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট। অগভীর সমুদ্রে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট তৈরির অন্যতম কাঁচামাল ‘ক্লে’ র সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের ১৩টি স্থানে ইলমেনাইট, গার্নেট সিলিমানাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইট সমৃদ্ধ ভারী খনিজ বালু পাওয়া গেছে। ধারনা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের সমুদ্র ভাগেও বড় ধরনের গ্যাসের মজুদ রয়েছে। ব্লু ইকোনমি ও নীল সমুদ্রের অর্থনীতির সম্ভাবনা সংক্রান্ত অনুসন্ধানী রিপোর্ট থেকে এ সব তথ্য জানা গেছে। এ সংক্রান্ত জরিপ ও অনুসন্ধান চালিয়েছে বাংলাদেশের জ¦ালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এই রিপোর্ট অনুযায়ী অগভীর সমুদ্রের তলদেশে কোবাল্ট, ভানাডিয়াম, মলিবডেনাম ও প্ল্যাটি নামে গঠিত ম্যাঙ্গানিজ ক্রাস্ট এবং তামা, সিসা, জিংক, কিছু পরিমাণ সোনা ও রূপা দিয়ে গঠিত সালফাইডের অস্তিত্ব রয়েছে। এ সব অতি মূল্যবান সম্পদ সমুদ্রের ১৪০০ থেকে ৩৭০০ মিটার গভীর তলদেশে রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশ শুধু অপার খনিজ সম্পদেই পূর্ণ নয় ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরতায় এক ধরনের ক্লের সন্ধান পাওয়া গেছে। অগভীর সমুদ্রের এই ক্লে উত্তোলন করা গেলে বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পে বিপ্লব ঘটে যাবে। কারণ ক্লে সিমেন্ট উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল।


সাগরে মূলত দুই ধরনের সম্পদ রয়েছে। এগুলো হলো প্রাণিজ ও অপ্রানিজ সম্পদ। প্রানিজ সম্পদের মধ্যে মৎস্য ও সামুদ্রিক নানা প্রানি, লতা গুল্ম প্রভৃতির কথা বলা যায়। বঙ্গোপসাগরে মৎস্য আহরনে বাংলাদেশ এখনও যথেষ্টভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। যদি পরিপূর্ণভাবে বঙ্গোপসাগরে মৎস্য সম্পদসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রানি মূল্যবান লতাগুল্ম আহরনের মাধ্যমে এগুলো যথাযথ প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে রপ্তানি পণ্য তালিকায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে। এমনিতেই রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র আনায়ন এবং রপ্তানি বাণিজ্যের বহুমুখী করণে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরের প্রানিজ সম্পদ বিরাট উৎস হয়ে উঠতে পারে।


বঙ্গোপসাগরে অপ্রানিজ সম্পদের শেষ নেই। অপ্রানিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, চুনাপাথর প্রভৃতি। খনিজের মধ্যে আরো রয়েছে ১৭ ধরনের খনিজ বালু। এর মধ্যে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট, গ্যানেট মোনাজাইট, কায়ানাইট, লিকোক্সিন উল্লেখযোগ্য। বঙ্গোপসাগরে এই আটটি খনিজ বালু বেশি পারিমানে পাওয়া যায়। এগুলোর দামও অনেক বেশি। বঙ্গোপসাগরে অর্জিত সমুদ্রসীমা থেকে প্রায় ১০ লাখ টন এসব খনিজ বালু আহরণ সম্ভব। এছাড়াও সাগরের তলদেশে ক্লেসার ডেপোজিট, ফসফরাস ডেপোজিট, এডাপোরাইট, পলিমেটালিক সালফাইড, মাঙ্গানিজ নডিউল নামক খনিজ পদার্থ আকরিক অবস্থায় পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। এদের পরিশোধনের মাধ্যমে লেড, জিংক, কপার, কোবাল্ট, মলিব ডেনামের মতো দুর্লভ ধাতুগুলো আহরন করা সম্ভব হবে। এ সব দুর্লভ ধাতু উড়োজাহাজ নির্মাণে, রাসায়নিক কারখানায় এবং বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদন কাজে ব্যবহার করা যাবে।


বঙ্গোপসাগর জড়িয়ে আছে বাংলাদেশে ও মিয়ানমারের সঙ্গে। বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানা নিয়ে বিরোধ ছিল তিন দেশের মধ্যে। ২০১২ তে মিয়ানমার, ২০১৪ তে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান বিরোধ নিস্পত্তি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতে রায়ের মাধ্যমে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হয়েছে। ফলে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রে বিরোধপূর্ণ ১৭টি ব্লকের ১২টি পেয়েছিল বাংলাদেশ। আর ভারতের দাবিকৃত ১০ ব্লকের সবগুলোই পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ভাগে যা পড়েছে তা বিশাল বলা যায়।
বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডে প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ দিনে দিনে কমে আসছে। অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদেরও আধিক্য কোনো সময়েই ছিলনা। সীমাবদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি জোরালো হতে পারেনি। বার বার হোঁচট খেয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রেও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বটে তবে এ অবস্থা একটানা দীর্ঘদিন বজায় থাকবে না। কৃষি জমির পুনঃব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা দিনে কমে আসছে। জনসংখ্যার চাপ এবং শিল্পায়ন-নগরায়নের কারণে কৃষি জমির পরিমাণ কমে আসছে। তেমনি প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর আমাদের অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য বিরাট ভরসার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠতে পারে। বঙ্গোপসাগরকে অবহেলা না করে এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। সাগরে বিরাজমান প্রানিজ সম্পদ, মৎস্য, সামদ্রিক প্রানি লতা, গুল্ম প্রভৃতি আহরনের বিষয়ে অতীতের গা ছাড়া মনোভাব ত্যাগ করে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে এ কাজে সংশ্লিষ্টদের। সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদ উত্তোলনের উদ্যোগ হতে হবে অনেক শক্তিশালী। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ যথাযথভাবে আহরণ করে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যেতে বেশি সময় লাগবে না। এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সমৃদ্ধির পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। আমাদের আগামী দিনের জ¦ালানী নিরাপত্তা নিয়ে অনেক আশংকার কথা শোনা যাচ্ছে। সেই আশংকাগুলো দূর করতে হলে বঙ্গোপসাগরের বিরাজমান খনিজ সম্পদকে পরিপূর্ণ ব্যবহারের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ব্লু ইকোনমি সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেল থেকে সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বিভিন্নভাবে কাজ করছে । সমুদ্র সম্পদ আহরনে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ এবং এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে ।

 

সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা আমাদের সবাইকে আশাবাদী করে তুলেছে। এ সব উদ্যোগ যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে বিপুল সম্ভাবনাময় বঙ্গোপসাগরের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার ঘটবে। দেশের বিরাজমান খাদ্য চাহিদা পূরনের পর সামুদ্রিক খাবার বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা সম্ভব হবে। এ সব সামুদ্রিক সম্পদ আহরন ও প্রক্রিয়াকরণ কাজে নিয়োজিত হবে দেশের বিরাট জনসম্পদ। এতে কর্মসংস্থানের দারুণ সুযোগ ও সৃষ্টি হবে সন্দেহ নেই। আর সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশেল অর্থনীতি আরো নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে বঙ্গোপসাগরের অব্যবহৃত খনিজ ও প্রানিজ সম্পদ আহরণ অবশ্যই প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপন কিংবা অবহেলার কোনো উপায় নেই।
বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন, এ খাতে সরকারের নীতি বিনিয়োগের অনুকূল নয়। বাংলাদেশের বার্ষিক বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হতে আগত ২৫০০ বাণিজ্যিক জাহাজের সাহায্যে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। বিদেশি জাহাজগুলোকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এ ব্যয় কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের মিঠা পানিতে যেখানে ২৫০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, সেখানে বঙ্গোপসাগরে রয়েছে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ। তার মধ্যে ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি রয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের ওপর প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করছে উপকূলীয় প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা। বড় ট্রলারের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে ৫০ থেকে ৬০ হাজার ছোট নৌকা ব্যবহার করে জেলেরা মাছ ধরছেন।
সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এখন এগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে বড় ট্রলারের অভাব এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরায় দক্ষতা না থাকায় পর্যাপ্ত মাছ আহরণ করা যাচ্ছে না। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় , সামুদ্রিক টোনা মাছের চাহিদা অনেক বেশি। এ মাছ খুব দ্রুত বিভিন্ন সাগরে ঘোরাফেরা করে। এগুলো গভীর সমুদ্র থেকে আহরণ করতে হয়। কিন্তু আমরা এসব মাছ আহরণ করতে পারছি না। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চল থেকে প্রচুর লবণ উৎপাদন করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস হাইড্রেট যা থেকে মিথেন গ্যাস উৎপাদন সম্ভব, পলিমেটালিক ম্যাঙ্গানিজ নডিউলস যাতে কপার, ম্যাগনেশিয়াম, নিকেল, কোবাল্টসহ মূল্যবান ধাতু রয়েছে। গ্যাস হাইড্রেট, পলিমেটালিক ম্যাঙ্গানিজ নডিউলস ছাড়াও পলিমেটালিক সালফাইড এবং কোবাল্ট সমৃদ্ধ ফেরোম্যাঙ্গানিজ ক্রাস্ট বাংলাদেশের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তা যাচাই-বাছাইয়ের লক্ষ্যে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে। সমুদ্র সৈকতে প্রাপ্ত জিরকন, ইলেমেনোইট, ম্যাগনেটাইট, রিউটাইলসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ সম্পদ পাওয়া গেছে। এসব খনিজ সম্পদের উত্তোলন ও ব্যবহার প্রয়োজন। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ফলে সমুদ্রের ব্লকগুলোতে গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশে ব্লু ইকোনমিতে বেসরকারি বিনিয়োগ পর্যাপ্ত নয়। ব্লু ইকোনমিতে কিছু কিছু বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে। বিশেষ করে মাছ ধরার ট্রলার, সমুদ্র ভ্রমণে পর্যটন, মালামাল পরিবহণ, আরও অনেক খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। তবে বিনিয়োগে মানুষকে আগ্রহী করে তোলার জন্য ব্র্যান্ডিং ঠিকমতো হচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে পলিসির বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বিস্তৃত সমুদ্র তলদেশ ও উপরিভাগ থেকে সর্বোচ্চ সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি খাতের অর্থায়নে সমুদ্রের নৈকট্য পরিমাপসহ জরিপ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top