ব্ল্যাক ফাঙ্গাস -আতঙ্ক নয় প্রয়োজন সচেতনতা | স্বাস্থ্য | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস -আতঙ্ক নয় প্রয়োজন সচেতনতা

ডাঃ তাসরিন সুলতানা ও ডাঃ শাহরিয়ার রোজেন

প্রকাশিত: ১ জুন ২০২১ ১০:৩৩ আপডেট: ১ জুন ২০২১ ১০:৩৭

ডাঃ তাসরিন সুলতানা ও ডাঃ শাহরিয়ার রোজেন | প্রকাশিত: ১ জুন ২০২১ ১০:৩৩

UCBL

ফাইল ছবি

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে । সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকে ভাবতে শুরু করেছেন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেমন ব্ল্যাক ফাঙ্গাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে তেমনিভাবে বাংলাদেশেও এটি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অযাচিত আতঙ্ক দূর করার জন্য জনগণের মাঝে বিজ্ঞানভিত্তিক সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়া অত্যন্ত জরুরি।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছোঁয়াচে কোন রোগ নয় অর্থাৎ এটি একজন হতে অন্যজনে ছড়াতে পারে না ।এটি বিরল কিন্তু নতুন কোনো রোগ নয় ।এই ছত্রাকটি অনেক আগে থেকে আমাদের পরিবেশে বিদ্যমান ছিল এটি ভারত থেকে এসেছে এমন কোন ছত্রাক নয়। করোনা মহামারী ছড়ানোর আগেও প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে একজনের শরীরে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ দেখা যেত ।সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সাধারণত চার থেকে ছয় সপ্তাহের মাঝেই ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ভালো হয়ে থাকে। কাজেই স্বাভাবিক অবস্থা থেকে এই রোগটি ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কি?
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস হল মিউকরমাইকোসিস বা এক ধরনের ছত্রাক জনিত বিরল রোগ যা সাধারণত মাটি, পচনশীল আবর্জনা, নোংরা পানি থেকে বাতাসের মাধ্যমে আমাদের আমাদের শরীরের যেকোনো ক্ষতস্থান, পুড়ে যাওয়া অংশ ,নাক চোখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
সাধারনত সাইনাস ,চোখ ,নাক, চোয়ালে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বেশি দেখা যায়।অনেক ক্ষেত্রে ইনফেকশন ফুসফুসে এমনকি ব্রেইনেও ছড়াতে পারে।

ঝুঁকিতে যারাঃ
১.কোভিড ১৯ বা করোনা ভাইরাস এর সাথে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও এটি পোস্ট কোভিড কমপ্লিকেশনের একটি উপসর্গ, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার ১২ থেকে ১৮ দিনের মাঝে দেখা যায় ।মুলত করোনায় আক্রান্ত বা করোনা থেকে সুস্থ ব্যক্তি যাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম, বিশেষত যাদের স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করতে হয়েছে অথবা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস আছে তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায় ।স্টেরয়েড-এর একটি পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হলো এটি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আবার ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে রক্তে ব্লাড সুগার বেড়ে যায় - ফলে ছত্রাক সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ তৈরী হয়। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পরলে "ব্ল্যাক ফাঙ্গাস" দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরী হয়।
২.গবেষণায় দেখা গেছে ব্ল্যাক ফাংগাসে আক্রান্ত দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৬% রোগীই অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ভুগছেন এবং দুই তৃতীয়াংশ রোগী স্টেরয়েড নিয়েছেন এবং আক্রান্তদের অধিকাংশ রোগীই পুরুষ।
৩.ইমিউনোকম্প্রোমাইজড রোগীরা অর্থাৎ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় কম যেমন ক্যান্সার বা HIV আক্রান্ত রোগী।
৪.দীর্ঘদিন কোভিড আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ছিলেন বা ভেন্টিলেশনে ছিলেন, অক্সিজেন, হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করেছেন।
৫.ধারণা করা হচ্ছে যারা বারবার একই মাক্স ব্যবহার বা দীর্ঘ সময় অপরিষ্কার মাক্স ব্যবহার করছেন তাদের মাঝে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে ।

উপসর্গ:
১. জ্বর, মাথাব্যথা। মাথার যে কোন একপাশে বা সাইনাসের ব্যথা হওয়া।
২. নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া ,নাক থেকে রক্ত পড়া,নাকেরচামড়ার পাশে কালো কালো ছোপ দাগ দেখা যাওয়া
৩. চোখ ব্যথা হওয়া এবং চোখ ফুলে যাওয়া ।চোখের পাতা ঝুলে পড়া অনেকের ক্ষেত্রে চোখের দৃষ্টি ও চলে যায়।
৪.চোয়াল নাড়াতে কষ্ট হওয়া।
৫.অনেক সময় বুক ব্যাথা, শ্বাসকষ্টও থাকতে পারে।
৬ কাশি বা বমির সাথে রক্ত যাওয়া ।

সুরক্ষার উপায়:
১.মূলত করোনার উচ্চ সংক্রমণে ভারতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ তাই করো না সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এবং মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ব্ল্যাক্স ফাঙ্গাস বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না।
২.করোনার ভয়ে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড ওষুধ গ্রহণ করা যাবে না।
৩.অক্সিজেন থেরাপি সময় হিউমিডিফায়ার পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
৪.ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তে ব্লাড সুগার লেভেল পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৫. উচ্চঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নির্মাণ বা খননকাজের জায়গা যেখান থেকে ধুলাবালি ছড়িয়ে পড়ছে এমন জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে, খালি পায়ে ঘোরাফেরা করা যাবে না, মোজা ছাড়া জুতা পরা যাবে না, ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের স্পর্শে যাওয়া পরিহার করতে হবে ।
৬. সব সময় পরিষ্কার মাস্ক পরতে হবে, একই মাস্ক বারবার ব্যবহার করা যাবে না।
৭.শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি, ডি, ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে।

একথা সত্য যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত করোনা রোগীদের মাঝে মৃত্যুর হার প্রায় ৫৪ ভাগ। তবে মনে রাখতে হবে সুস্থ সবল মানুষকে এই জীবাণু সংক্রমণ করে না এমন কি ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগটি করোনার মতন সংক্রামকও নয়। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। পাশাপাশি সকলকে মনে রাখতে হবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড সেবনে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে তাই অপ্রয়োজনীয়' ওষুধ গ্রহণ পরিহার করুন।

লেখক: ডাঃ তাসরিন সুলতানা, রিসার্চ এবং পলিসি এনালিস্ট, সেন্টার ফর রিসার্চ, ইনোভেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাকশন, কানাডা এবং ডাঃ শাহরিয়ার রোজেন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র পলিসি বিশ্লেষক, কানাডা

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top