ইস্টার্ন ব্যাংক প্রণোদনার টাকা এনজিও‘র মাধ্যমে ৯ শতাংশ হারে কৃষকদের মাঝে সরাসরি ঋণ দিচ্ছে | সাক্ষাৎকার | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি

ইস্টার্ন ব্যাংক প্রণোদনার টাকা এনজিও‘র মাধ্যমে ৯ শতাংশ হারে কৃষকদের মাঝে সরাসরি ঋণ দিচ্ছে

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২১ ১৭:৪৪ আপডেট: ১৯ মে ২০২১ ২১:৪৮

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২১ ১৭:৪৪

UCBL

অলংকরণ : রাজিব হাসান

[করোনাকালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণ পরিস্থিতি নিয়ে সাক্ষাৎকারভিত্তিক ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে অপরূপ বাংলা‘য়। যেখানে কৃষিঋণ বিতরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা. প্রণোদনার টাকার সঠিক ব্যবহারসহ কৃষিঋণের নানা দিক তুলে ধরা হচ্ছে। অভিজ্ঞ  ব্যাংকারদের কাছ থেকে আসছে নানা পরামর্শ। এবারের এসব বিষয়ে কথা বলেছেনে ইস্টার্ন ব্যাংকের ‍ উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. খোরশেদ আলম। সাক্ষাৎকারের  উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো ]

অপরূপ বাংলা : করোনাকালে কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে কি ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন?

মো. খোরশেদ আলম: করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে বিশ্বব্যাপী শুধু যে মানুষের জীবন জীবিকা বিপন্ন হয়েছে তাই নয়, কৃষি এবং কৃষি কাজে সম্পৃক্ত লোক জনের ওপর করোনার আঘাত মারাত্মক। করোনা কালীন সময়ে কৃষি ও কৃষকের সমস্যা ও দুর্দশা অপরিসীম। পরিবহণ ব্যবস্থা যেমন বাস- ট্রাক, রেল যোগাযোগ ও নৌপরিবহন বন্ধ থাকায় কৃষিজাত পণ্য তথা কৃষকের যে ক্ষতি, তা বিশাল। নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আবহাওয়ার প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তাকে যেমন টিকে থাকতে হয়, তেমনি জাতিকে ক্ষুধামুক্ত রাখতে এবং অপুষ্টি থেকে বাঁচাতে আমাদের কৃষক ভাইদের অবদান অনেক। করোনার কারনে চারিদিকে লক ডাউন, যার ফলে কৃষকরা তাদের ফসল নিয়ে যেমন বিপাকে পড়েছেন, তেমনি উপযুক্ত দামে তাদের পণ্য বিক্রয় করতে পারছে না। বিশেষ করে সবজী চাষিদের বড় রকমের সর্বনাশ হয়ে গেছে।
তাই , এসকল সমস্যা মোকাবিলায় সরকার পরিবহন ব্যবস্থা তথা ট্রাকে বিভিন্ন জেলা থেকে তরিতরকারি ক্রয় করে ঢাকা ও বড় শহরে এনে বস্তিবাসী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে চাল-ডালের মতো বিতরণ করতে পারে, তাতে কৃষকেরা উপকৃত হবেন এবং সবচেয়ে বেশি উপকার হবে উপার্জনহীন দরিদ্র গৃহবন্দী মানুষের। সরকার সবজি সংরক্ষণের জন্য সরকারীভাবে হিমাগার স্থাপন করতে পারেন। কৃষকদের /খামারিদের জন্য প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণের কিস্তির সময় বাড়ানো, খুব বেশি ক্ষতি যাদের হয়েছে, তাদের ঋণের সুদ মওকুফ অথবা এককালীন সাহায্য দেওয়ার জন্য তহবিল গঠন করতে পারেন। সেই সাথে সার ও কীটনাশক ভর্তুকি হিসাবে প্রদান করা এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

মো. খোরশেদ আলম, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইবিএল

অপরূপ বাংলা: সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা পর্যাপ্ত কি না?

মো. খোরশেদ আলম: আমাদের অর্থনীতির পরিমাপ অনুযায়ী সরকার চেষ্টা করছেন বিভিন্ন সেক্টরের বিশেষ করে করোনাকালিন ক্ষতিগ্রস্থ খাত গুলোকে বিশেষ প্রনোদনা সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখা। করোনাভাইরাসের কারণে দেশে খাদ্যাভাবের মারাত্মক প্রভাব যাতে না পড়তে পারে, তার জন্য সরকার কোনো জমি অনাবাদি না রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার নতুন একটি স্কিম গঠন করবে যাতে সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ। এই তহবিল থেকে গ্রামাঞ্চলে যাঁরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি, তাঁদের দেওয়া হবে। যাঁরা পোলট্রি, কৃষি ফার্ম, ফলমূল, মসলাজাতীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদন করবেন, তাঁরা এখান থেকে ঋণ নিতে পারবেন, যাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং সরবরাহ হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সারের ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার কোটি টাকা, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের জন্য ১০০ কোটি টাকা, বীজের জন্য ১৫০ কোটি টাকা এবং কৃষকদের জন্য আরও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে, যা দিয়ে করনাকালিন সমস্যা মোকাবিলা করে কৃষি খাতের উন্নয়নের গতিধারা সচল থাকবে।

অপরূপ বাংলা: বেসরকারি ব্যাংকগুলো কি ভূমিকা পালন করতে পারে?

মো. খোরশেদ আলম: বেসরকারী ব্যাংকগুলি কৃষি খাত উন্নয়নে ব্যাপক ভুমিকা পালন করছে, তার ফলস্বরূপ এখন আমরা এক বছরে প্রায় ৫.২ কোটি টন খাবার উৎপাদন করতে পারছি। ব্যাংকগুলি এই খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা না দিলে এটি সম্ভব ছিল না। বেশিরভাগ ব্যাংক বছরের পর বছর তাদের কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করছে এবং কৃষি উন্নয়নে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্যো ঋণ বিতরণের চেষ্টা করছে। তবে গ্রামীণ অঞ্চলে যাদের উল্লেখযোগ্য শাখা নেই এমন কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ বিতরনের বাধা রয়েছে। এই সকল ব্যাংকগুলি কৃষকদের মাঝে সরাসরি ১০০% কৃষি ঋণ বিতরণ করতে পারে না। এসকল ব্যাংক এনজিও’র মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য মাত্রা পুরনের চেষ্টা করে থাকে।

ব্যাংকগুলো এখন এজেন্টের মাধ্যমে কৃষকের হাতে ঋণের টাকা পৌঁছে দিতে পারছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক গুলো তাদের মোট কৃষি ঋণের ৭০ ভাগই বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে বিতরণের সুযোগ পাচ্ছে।এনজিওর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ না থাকা ও নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই কৃষি ঋণের সুফল পাচ্ছেন না কৃষকরা। তবে, প্রনোদনার টাকা এনজিও’র মাধ্যমে ৯% হারে কৃষকদের মাঝে সরাসরি ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার


অপরূপ বাংলা: ইস্টার্ন ব্যাংক বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি?

মো. খোরশেদ আলম: হ্যাঁ, ইস্টার্ন ব্যাংক প্রতিবছর কৃষি ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৭৫% এরও বেশি অর্জন করে থাকে। আমাদের গ্রাম পর্যায়ে শাখা খুব কম হওয়ায় আমরা এনজিও সংযোগের মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি। এর পাশাপাশি আমরা আমাদের নিজস্ব চ্যানেলের মাধ্যমেও ৮শতাংশ হারে কৃষি ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করছি। এনজিও’র মাধ্যমে কৃষি ঋণ বিতরণের ফলে কৃষক ঋণ পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত সুদ গুনতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকে। বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যায়ে এজেন্ট ব্যাংকের শাখা ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যাংকগুলো এখন এজেন্টের মাধ্যমে কৃষকের হাতে ঋণের টাকা পৌঁছে দিতে পারছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক গুলো তাদের মোট কৃষি ঋণের ৭০ ভাগই বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে বিতরণের সুযোগ পাচ্ছে।এনজিওর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ না থাকা ও নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই কৃষি ঋণের সুফল পাচ্ছেন না কৃষকরা। তবে, প্রনোদনার টাকা এনজিও’র মাধ্যমে ৯% হারে কৃষকদের মাঝে সরাসরি বিতরণ করা হচ্ছে, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। ইস্টার্ন ব্যাংকও এনজিও’র মাধ্যমে ৯% হারে কৃষকদের মাঝে সরাসরি ঋণ বিতরণ করছে। নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এই বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বা এনজিওগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ তিন বছর মেয়াদি যা একক গ্রাহকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা এবং গ্রুপভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পাঁচ জনের সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণের আওতায় এককভাবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং গ্রুপভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা।

অপরূপ বাংলা: বাজার ব্যবস্থা সচল রাখতে কি ভূমিকা নেয়া উচিত?

মো. খোরশেদ আলম: কৃষি অর্থনীতি, উৎপাদন এবং বিপণনে বাজার ব্যবস্থা উজ্জীবিত রাখা করোনা প্রতিরোধে গঠিত পদক্ষেপের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করা যেতে পারে কৃষি উৎপাদন ও বিপণনের ওপর জোর দিয়ে। আমাদের দেশের বাজারব্যবস্থার গঠন সুবিন্যস্ত নয়। বেশির ভাগ পণ্য পচনশীল, তাই তাদের প্রক্রিয়াকরণ ও যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন। প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি থাকায় এবং পচনশীল বিধায় অনেক শাকসবজি ও কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদকদের কৃষিবিমুখ করতে পারে। তাই, কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বাজার ব্যবস্থা বিশেষ করে সঠিকভাবে পাইকারি ও খুচরা বাজার সৃষ্টি, গ্রোয়ার্স মার্কেট, সংরক্ষণের সুব্যবস্থা করা, বিশেষ করে গুদামজাতকরণ বা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থা করা।বাংলাদেশ কৃষি বিপণন ও সমবায় বিপণন খুবই ফলপ্রসূ ধারণা। আমাদের কৃষক ভাইয়েরা কম শিক্ষিত, আর্থিকভাবেও তারা খুব বেশি সচ্ছল নয়, তাই সমবায় বিপণনের মাধ্যমে নিজেরা বেশী লাভবান হতে সহায়তা পাবে। সেই সাথে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল, ফড়িয়া ও আড়তদারদের কারসাজি দূর করতে পারবে। কৃষি উৎপাদন ও বিপণন সুনিশ্চিত করতে হলে সরবরাহ নিশ্চিত ও গতিশীল রাখতে হবে। স্বল্পমাত্রায় হলেও সার, বীজের সরবরাহ যাতে সচল থাকে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন যাঁরা মাছ চাষ করেন, তাঁরা যদি প্রয়োজনীয় ফিড বা মাছের খাবারের জোগান না পান, তাহলে তাঁদের মাছ চাষের কার্যক্রম ব্যাহত হবে। একই অবস্থা পোলট্রি মুরগি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও। অন্যথায় বাজারে জোগান ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না। তাই আসুন, সবাই মিলে করনাকালিন সময়ে কৃষকভাইদের পাশে দাড়াই, বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করি, তাহলে আমাদের খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে না, সবাই মিলে একটা সুন্দর দেশ গড়তে পারব।

 

 

 

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top