বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ | শোকাবহ আগস্ট | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮
শোকাবহ আগস্ট

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

স্বপঞ্জয় চৌধুরী

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২১ ১১:২৪ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৬:৩৭

স্বপঞ্জয় চৌধুরী | প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২১ ১১:২৪


অলংকরণ : রাজিব হাসান

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মিশে আছেন বাংলার মাঠ, ঘাট, প্রান্তরে। তার ছায়া মিশে আছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের স্রোতধারায়। মিশে আছেন আমাদের জাতীয় চেতনা ও অস্তিত্বে। যার নাম মুখে আনলে মনের অজান্তেই শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে আসে মাথা, যার ঐতিহাসিক ভাষণ শুনলে বুকের ভেতর বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। আমার সমস্ত শরীরেই প্রবাহিত হয় একাত্তরের চেতনা। এই ২০২১ সালে এসেও আমি একাত্তরকে অনুভব করি। আমার অদেখা মুক্তিযুদ্ধ কেমন ছিল। কীভাবে অত্যাচারিত হয়েছে আমার মা, ভাই, বোন, দেশের শ্রমজীবী মানুষ তার ধারণা পাই বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণে।

বঙ্গবন্ধুর প্রখর ব্যাক্তিত্ব, মানুষের প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসা তাকে বিশ^নেতার মর্যাদায় অধীষ্ঠ করেছিল। তিনি শুধু এই উপমহাদেশের পরিমন্ডলেই নয়। সারা বিশ্বের মানুষের কাছে ছিলেন জনপ্রিয়, জননন্দিত, অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। নিচে বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো।

শেখ মুজিবুর রহমান (১৭ মার্চ ১৯২০ - ১৫ আগস্ট ১৯৭৫), সংক্ষিপ্তাকারে শেখ মুজিব বা মুজিব, ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও দক্ষিণ এশিয়ার একজন অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি বাঙালির অধিকার রক্ষায় ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত বিভাজন আন্দোলন এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কেন্দ্রীয়ভাবে নেতৃত্ব প্রদান করেন। প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার আধুনিক স্থপতি হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের "জাতির জনক" বা "জাতির পিতা" বলা হয়ে থাকে। তিনি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত আওয়ামীলীগের সভাপতি, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তীতে এদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। জনসাধারণের কাছে তিনি শেখ মুজিব এবং শেখ সাহেব হিসাবে বেশি পরিচিত ছিলেন এবং তার উপাধি "বঙ্গবন্ধু"। তার কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্তমান সভানেত্রী এবং বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

১৯৪৭-এ ভারত বিভাগ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে শেখ মুজিব ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা। পরবর্তীতে তিনি আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সভাপতি হন । সমাজতন্ত্রের পক্ষসমর্থনকারী একজন অধিবক্তা হিসেবে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি একসময় ছয় দফা স্বায়ত্ত্বশাসন পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন যাকে পশ্চিম পাকিস্তানে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রধান ছিল বর্ধিত প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন যার কারণে তিনি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের অন্যতম বিরোধী পক্ষে পরিণত হন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকারের সাথে যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তার বিচার শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করে। তথাপি তাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া হয় নি।

 

১৯৭৫ সালের পনেরোই আগষ্ট বাংলাদেশের জন্য একটি কলঙ্কিত দিন, একটি লজ্জার দিন, একটি গভীর শোকের দিন। যে দিন জাতি কখনো ভুলতে পারবে না। কিছু সংখ্যক ক্ষমতালোভী চক্রান্তকারী সৈনিকের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হন। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশটি বঙ্গবন্ধুর শূন্যতায় এখনো কেঁদে ওঠে প্রতি বছর পনেরোই আগস্টে

 

পাকিস্তানের নতুন সরকার গঠন বিষয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে শেখ মুজিবের আলোচনা বিফলে যাওয়ার পর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মার্চ ২৫ মধ্যরাত্রে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা পরিচালনা করে। একই রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীকালে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। রহিমুদ্দিন খান সামরিক আদালতে তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে তবে তা কার্যকর করা হয় নি। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ১৯৭২-এর ১২ই জানুয়ারি তিনি সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মতাদর্শগতভাবে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ছিলেন, যা সম্মিলিতভাবে মুজিববাদ নামে পরিচিত। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করে সংবিধান প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্র চালনার চেষ্টা সত্ত্বেও তীব্র দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সর্বব্যাপী অরাজকতা এবং সেই সাথে ব্যাপক দুর্নীতি মোকাবেলায় তিনি কঠিন সময় অতিবাহিত করেন। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনের লক্ষ্যে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এক দলীয় রাজনীতি ঘোষণা করেন। এর সাত মাস পরে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে একদল সামরিক কর্মকর্তার হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হন। ২০০৪ সালে বিবিসি'র সম্পাদিত একটি জরিপে শেখ মুজিবুর রহমান "সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি" হিসেবে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত হন।

আমার মুজিব এ বিষয়ে লিখতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যাবে। তবুও মনে হবে যেন মনের অনুভূতি জানানো এখানো বাকী রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ মায়াময় দুটো শব্দ আমার প্রাণকে স্পন্দিত করে- “জয় বাংলা”। এ দুটো শব্দ কোটি কোটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল। যেকোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বে হাজার হাজার লোক হাঁক দিয়ে উঠতো- জয় বাংলা। সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যেত কিংবা কুচকাওয়াক মার্চ করার সময় গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠতো- জয় বাংলা। যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা এমন একটা অবস্থায় ছিলাম। বাঁচা মরার এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে। হয় মৃত্যু, নয় জীবিত নয়তো আহত হয়ে পঙ্গু জীবন যাপন করা। এমন পরীক্ষার মুখে আমাদেও মুখে শক্তি জুগিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মুখনিসৃত অমর বাণী ‘জয় বাংলা’। এই স্লোগানের সাথে পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছিল। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর যে বিষয়টি আরসব বাঙালির মতো আমাকেও বিমোহিত করে। সেটি হচ্ছে তার ধর্ম নিরপেক্ষবাদ। তিনি আমাদেরকে বলে গিয়েছেন অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরনিরপেক্ষতার কথা। ধর্মকে রাজনৈতিক ব্যবহার থেকে মুক্ত রেখে, যার যার ধর্ম সে সে তার রীতিনীতি অনুযায়ী পালন করবে। প্রত্যেকের ভেতর থাকবে সহমর্মিতা ও মনুষ্যত্বের অমর বাণীর অনুপ্রেরণা। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “ মনুষ্য ধর্ম হলো সবচেয়ে বড় ধর্ম।” আমার মধ্যে যদি মুনষ্যত্ব না থাকে, আমি যদি মানুষের বিপদে, দুঃখে মানুষের পাশে না দাঁড়াই তাহলে আমি কিসের মানুষ হলাম। বঙ্গবন্ধু আমাদেও শিখিয়েছিন। কীভাবে দুঃখী ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। গরিব, দুঃখী মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখে তার মন কেঁদে উঠতো। নিজের পরিবারকে সময় না দিয়ে তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে জেলখানায়। শুধুমাত্র বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। গরীব দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য তিনি সংগ্রাম করে গেছেন আমৃত্যু।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও স্বপ্নদ্রষ্টা। মুক্তিযুদ্ধেও বিপক্ষ শক্তি বহুবার তাদের দুষ্টচক্রের দ্বারা ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কী ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা যায়। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। এ বাংলার আকাশ, বাতাস, মাটি, নদী, পাহাড় প্রতিটি ধূলিকণায় বঙ্গবন্ধুর নাম লেখা আছে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার এক লেখায় বলেছেন- “ তাঁর চেয়েও বড় বড় নেতা আরও ছিলেন, যাঁরা নিজেদেও শিক্ষায় ও বিত্তে বড় মনে করতেন। কিন্তু তাঁরাও কেউ ওই জায়গায় যেতে পারেননি, যে জায়গায় বঙ্গবন্ধু পৌঁছেছিলেন। আজকে শুনি, স্বাধীনতা কবে ঘোষণা করা হলো? কে ঘোষণা করলো? এই তর্ক হয়। স্বাধীনতা এক দিনে আসেনি। যদি ঘোষাণার কথাই বলা হয় তাহলে ৭ই মার্চেও জনসভায় বঙ্গবন্ধু যে ঘোষণা দিয়েছিলেন সেই ঘোষণাই স্বাধীনতার ঘোষণা। সেই রকম রাজনৈতিক বক্তৃতা এদেশে আর কেউ দেননি।”

১৯৭৫ সালের পনেরোই আগষ্ট বাংলাদেশের জন্য একটি কলঙ্কিত দিন, একটি লজ্জার দিন, একটি গভীর শোকের দিন। যে দিন জাতি কখনো ভুলতে পারবে না। কিছু সংখ্যক ক্ষমতালোভী চক্রান্তকারী সৈনিকের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হন। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশটি বঙ্গবন্ধুর শূন্যতায় এখনো কেঁদে ওঠে প্রতি বছর পনেরোই আগস্টে। কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতার কিছু লাইন দিয়ে লেখা সমাপ্ত করবো।
“ মুজিব মানে আর কিছু না
মুজিব মানে মুক্তি,
পিতার সাথে সন্তানদের
না-লেখা প্রেম চুক্তি।
অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে তিনি আমাদের সকল সন্তানদের সাথে অলেখা এক চুক্তি করেছেন। আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে দেশ থেকে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, মাদক, দুর্নীতিকে দূর করবো। তবেই বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। আমরা দেখতে পাবো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে প্রকৃত অর্থে ক্ষুধা ও দুর্নীতিমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। প্রত্যেকেই অন্তরে ধারণ করতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। মুজিব তোমার, মুজিব আমার, মুজিব লক্ষ কোটি জনতার। সত্যের আরেক নাম মুজিব, মুক্তির আরেক নাম মুজিব, বাংলাদেশের আরেক নাম মুজিব, স্বাধীনতার আরেক নাম মুজিব।


লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, সাউথ পয়েন্ট কলেজ,বারিধারা, ঢাকা।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top