শোক ও শক্তির উৎস | শোকাবহ আগস্ট | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮
শোকাবহ আগস্ট

শোক ও শক্তির উৎস

সেলিনা হোসেন

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২১ ০০:১৩ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৫:০৮

সেলিনা হোসেন | প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২১ ০০:১৩


অলংকরণ : রাজিব হাসান

বাঙালি, বাঙালিত্বের নির্যাসে যুক্ত হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অমোঘ উচ্চারণ ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব ‘ আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, জয় বাংলা।’ এই উচ্চারণের সঙ্গে তিনি বলিষ্ঠ নেতৃত্বে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় বাঙালিকে উজ্জীবিত করে বাঙালিত্বের গৌরবকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই সময়ে তার মৃত্যু বিশ্বজোড়া বাঙালির সামনে শুধু শোকের দিন নয়। গৌরব এবং মর্যাদা জায়গা থেকে তিনি বাঙালির সামনে তিনি মৃত্যুহীন মানুষ।
হাজার বছরের বেশি সময় ধওে এই ভূখণ্ড নানা নামে পরিচিত হয়েছিল। বলা হতো বঙ্গ-পুন্ড্র-সুহ্ম-গঙ্গাঋদ্ধি-বজ্রভূমি- জ্যোতিষপুর-সমতল-হরিকেল-তম্রলিপ্ত-চন্দ্রদ্বীপ-রাঢ়- গৌড়-বাগঢ়ী ইত্যাদি নাম ছিল বিভিন্ন অঞ্চলের। ইতিহাসবিদ মহম্মদ আমীর হোসেন তার ‘ বঙ্গ বঙ্গাল বাঙ্গালা বাঙ্গালি বিনির্মিত নির্মাণ’ বইয়ে বলেছেন, পাল ও সেন বংশের শাসনকালে বর্তমানের বাঙ্গলা অঞ্চল সাধারণ ভাবে গৌড় বলেই পরিচিত হয়েছে। তাই এই বর্ণহিন্দু সমাজ সাধারণ ভাবে নিজেদেও ‘গৌড়জন’ বা ‘গৌড়বাসী’ বলেই চিহ্নিত করতে চেয়েছে স্থানবাচক জাতিত্ব পরিচিতির বিষয়ে। বাঙ্গা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেন রাম মোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩)। তিনি তার এই ব্যাকরণের নামকরণ করেন ‘গৌড়র ব্যাকরণ।’ বাঙ্গালি, বাঙ্গলা ভাষার স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। নবম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে রচিত বাংলা ভাষার আদি নির্দশন চর্চাপদেই বাঙালি শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদরা নৃতাতিত্ত্বক জাতিগোষ্ঠী প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘নৃতাত্ত্বিক জাতি সত্তার বিচাওে বাঙালি জাতি একই নৃতাত্ত্বিক জাতি সত্তার বংশধর নয়।’ বাঙালি একটি সংকর জাতি। একাধিক নৃগোষ্ঠী ও রক্তের সংমিশ্রণে বর্তমানে বাঙালি জাতির (Race) উৎপত্তি। ইতিহাসবিদরা আরো বলেছেন, ‘এই জাতিসত্তার মানুষরা মূলত ‘পূর্ববঙ্গীয় ভূমিপুত্র।’ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানে ‘বাঙ্গাল’ শব্দের অধিবাসী হিসেবে লিখেছেন ‘পূর্ববঙ্গের অধিবাসী।’ বাঙালির পরিচয় খুটিয়ে দেখার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। তবে এটা সত্য যে, সে সময়ের পূর্ববঙ্গ আজকের বাংলাদেশ। যে বাঙালি সংকর জাতি হিসেবে অবজ্ঞাত ছিল তার পরিচয়ের দৃঢ়তা প্রতিষ্ঠিত করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, আজ আমি বলতে পারি ‘ আজ আমি বলতে পারি আমি বাঙালি। আজ আমি বলতে পারি ‘ বাঙালি একটি জাতি। আজ আমি বলতে পারি বাংলার মাটি আমার মাটি। এর বেশি তো আমি চাই নাই।’ প্র¬খ্যাত ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় তার ‘ বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব’ গ্রন্থে বলেছেন, গৌড় নাম লইয়া বাংলার সমস্ত জনপদগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করিবার যে চেষ্টা শশাঙ্ক, পাল ও সেন রাজারা করিয়াছিলেন সে চেষ্টা সার্থক হয় নাই। সেই সৌভাগ্য লাভ ঘটিল বঙ্গ নামের, যে বঙ্গ ছিল আর্য সভ্যতা ও সৃংস্কৃতির দিক থেকে ঘৃৃনিত ও অবজ্ঞাত এবং যে বঙ্গ নাম ছিল পাল ও সেন রাজাদের কাছে কম গৌরবের ও আদরের। কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশের নাম লইয়া ঐক্যবদ্ধ হওয়া হিন্দু আমলে ঘটে নাই: তাহা ঘটিল তথাকথিত পাঠান আমলে এবং পূর্ণ পরিণতি পাইল আকবর আমলে, যখন সমস্ত বাংলাদেশ সবা বাংলা নামে পরিচিত হইল। ইংরাজ আমলে বাংলা নাম তার পূর্ণতর পরিচয় ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, যদিও আজিকার বাংলাদেশ আকবরী সুবা বাংলা অপেক্ষা খর্বীকৃত।’
বিশ্বজুড়ে বাংলার যে পরিচিতি সেই অর্থে এই ভূখন্ডকে শুধু ভৌগলিক আকারে খর্বীকৃত বলার সুযোগ নেই। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের অপেক্ষায় সময়ের পরিসর অতিক্রম করেছে। তিনিই উপমহাদেশের একমাত্র নেতা যিনি উপমহাদেশের মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংযোজন ঘটিয়েছেন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি এই অর্জনে নিজেদের নিবেদন করেছেন বীরদর্পে। মানুষের ভালোবাসার অবিস্মরণীয় চেতনাবোধে সিক্ত হয়েছে তার নেতৃত্বেও দৃঢ়তা। তার মৃত্যুদিবস মৃত্যুর উর্ধ্বে জীবনসত্যেও বড় পরিচয়। বিশ্বের অনেক নেতা যেভাবে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আছেন অজেয় প্রেরণায় তেমনি বঙ্গবন্ধু আছেন। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচিত হন। তিনি পরিচয়ের মুগ্ধতা নিয়ে বলেন, ‘ আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্বে ্এই মানুষটি হিমালয়সম। এতেই আমার হিমালয় দেখা হলো।’ এভাবে বাংলাদেশ নামের ছোট ভূখণ্ড বিশ্বের সামনে বিশাল হয়ে উঠেছিল। শুধু ভৌগলিক আকারের খর্বতা কাটিয়ে উচ্চতার শীর্ষে উঠার যে দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধু সেই অসাধ্য কাজটি পূর্ণ করেছিলেন। বিশ্বের অন্য অনেক নেতার মতোই তিনি দেশের পরিচিতি বিস্তৃত করেছিলেন। নেলসন ম্যান্ডেলার নামের সাথে যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা, হো চি মিনের নামের সঙ্গে ভিয়েতনাম, সকর্ণের নামের সাথে ইন্দোনেশিয়া, মিশরের নামের সঙ্গে কর্নেল নাসের, প্যালেস্টাইন নামের সঙ্গে ইয়াসির আরাফাত এমন আরো অনেকে। তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান। তার নাম উচ্চারণ না করে বাঙালির আত্মপরিচয় কখনো পূর্ণ হবে না।
তিনি বাঙালির ত্রানকর্তা। হাজার বছর ধরে বাঙালি এই ত্রানকর্তার অপেক্ষায় ছিল। বাঙালির সভ্যতা-সংস্কৃতির আবহমান স্রোতে তিনি নতুন অভ্যুদয় ঘটিয়েছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণ রূপ লাভ করেছে। তিনি আবহমান কালের নিপীড়িত বাঙালির কন্ঠস্বর বদলে দিয়ে কঠিন ভাষায় উচ্চারণ করেছেন : আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া, বাংলার মাটি তাই দিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।’
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর নতুন রাষ্ট্রের পাকিস্তানের অংশ হয় ইতিহাসের বঙ্গের পূর্বাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধুর জাতি সত্তার দর্শনের জায়গা থেকে পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ববাংলা বলার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৫৫ সালে ২৫ আগস্ট তিনি গণপরিষদে বলেন, ‘স্পিকার মহোদয়, পূর্ব বাংলার নাম বদল করেছে। পূর্ব পাকিস্তান। বাংলা নাম ব্যবহার করার জন্য আমরা দাবি জানাই। বাংলা নামের ইতিহাস আছে, তার ঐতিহ্য আছে। এই নাম পরিবর্তন করতে বলে বাংলার মানুষকে জিজ্ঞেস করতে হবে। নাম বদল করার জন্য তারা রাজি আছে কি না তাদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।’ নিজ আইডেনটির পরিচয় হিসেবে বাংলা শুধু শব্দমাত্র ছিল না, ছিল জীবনদর্শনসহ জাতি সত্তার পরিচয়। মানুষ হিসেবে পরিচয়ের পরে প্রতিটি মানুষের জাতিসত্তা নিয়ে বেঁচে থাকার সত্য ধারণ করতে হয়। তিনি এই বিশ্বাস প্রত্যেক বাঙালির রন্ধ্রে ঢুকিয়েছেন।
ভাষা জাতিসত্তার আইডিনটির একটি অন্যতম উপাদান। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নেও বক্তব্য রেখেছেন। ১৯৫৫ সালের ৯ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বলেছিলেন : ‘ শেখ মুজিবুর রহমান : মাননীয় ডেপুটি স্পিকার মহোদয়, আমাকে বাংলায় কথা বলতে হবে ।(কথার মাঝে বাঁধা দান)। শেখ মুজিবুর রহমান : মাননীয় ডেপুটি স্পিকার বাংলা বুঝতে পারেন না বলে আমি দু:খিত। (মাননীয় স্পিকার মহোদয় আজ বাংলা ভাষায় আমাকে বক্তব্যদানের সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই।’
১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারি গণপরিষদে আবার বাংলা পক্ষে বক্তব্য রাখেন: ‘শেখ মুজিবুর রহমান: মহোদয়, একটি বিশেষাধিকার প্রশ্নে আপনার দৃষ্টি আকর্ষন করছি। মহোদয়, পাকিস্তান গণপরিষদের কার্যবিধি ২৯ এর অধীনে সুস্পস্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংসদের সরকারি ভাষা হচ্ছে তিনটি : ইংরেজি, বাংলা ও উর্দু। কিন্তু মহোদয়,দিনের আলোচ্য কর্মসূচি কেবল ইংরেজি ও উর্দুতে বিতরণ করা হয়, বাংলায় করা হয় না। আমি জানি না ্িবষয়টি আপনি অবগত আছেন কি নাই, কিংবা এটি ইচ্ছাকৃত করা হয়েছে কি না।... শেখ মুজিবুর রহমান : কার্যবিবরণী নিশ্চয়ই বাংলায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যেহেতু তিনটি ভাষাই সরকারি ভাষাহিসেবে স্বীকৃত সেহেতু তিনটি ভাষাকেই সমান মর্যাদা দিতে হবে। যদি দিনের আলোচ্য কর্মসূচি ইংরেজি ও উর্দুতে প্রকাশ করা হয় তাহলে অবশ্যই বাংলাতেও করতে হবে। কেননা দিনের আলোচ্য কর্মসূচি কার্যবিবরণীরই অংশ বিশেষ।.... যেহেতু দিনের আলোচ্য কর্মসূচি ইংরেজি ও উর্দুতে প্রকাশ করা হয়েছে সেহেতু তা বাংলাতেও করা উচিত ছিল।’
এভাবে তিনি নিজের জাতিসত্তার অধিকারের প্রশ্নে অনড় ছিলেন। কোথাও সামন্যতম আপোস করেননি। ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ স্মরণে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘আজকের এই দিনে স্মরণ করি সেইসব শহীদকে যারা নিজের জন্মভূমিকে ভালোবাসার অপরাধে অত্যাচারী শাসকের মরণযজ্ঞে অকালে আত্মাহুতি দিয়েছেন।... যতদিন বাংলার আকাশ থাকবে, ততদিন শহীদদের আমরা ভুলতে পারবো না। আমরা কোনোক্রমেই শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। এই বিজয় সাত কোটি বাঙালির বিষয় দরিদ্র জনসাধারণের বিজয়।’
শহীদদের আত্মত্যাগকে তিনি বাংলা অস্তিত্বের সঙ্গে এক করে দেখেছেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন শহীদদের জীবন উৎসর্গ চিরজাগরূক থাকবে।
এই প্রাজ্ঞ দার্শনিক ভাবনা বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার মাতৃভাষার মর্যাদায়। বাঙালির বিত্তবৈভবকে তিনি লালন করেছেন নিজের আত্মপরিচয়ের সবটুকু জায়গাজুড়ে। বাঙালির এই পথপরিক্রমাকে প্রখ্যাত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক মূল্যায়ন করেছেন সৃজনশীল মাত্রায়- ‘ পরাধিন বাংলায় তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী থেকে ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠেন সকলের ‘মুজিব ভাই’, জনগণের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত হয়ে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন। রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করল তার শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করলেন ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার বিকাশের চিরকালীন অর্গল খুলে গেল, বাঙালি জাতিসত্তা একটি রাষ্ট্রভাবনায় পরিণত হল। খুব কাছ থেকে তাকে যারা দেখেছেন তারা বলতে পারবেন, এই মানুষটির বিরাটত্ব কোথায় লুকিয়ে ছিল। সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে তাদের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন তাদের দু:খ-সুখের সাথী হয়ে। বিচক্ষনতার সাথে লক্ষ করলে বোঝা যায় যে, ‘বাঙালিত্ব’ বিষয়টি মূর্তিমান হয়ে রয়েছে তার ব্যবহাওে, খাদ্যাভ্যাসে, পোশাকে। সব চেয়ে বেশি করে তার মননে চিন্তনে, আবেগ অনুভূতির অনুরণনে। সেজন্যই ছাত্রসমাজ থাকে গ্রহণ করল ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে, এই নামেই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো সমগ্র জাতির সাথে তার পরিচয়ের সেতুবন্ধ।’
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে ফিরে রমনা রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে, মানুষ করোনি। কিন্তু আজ আর কবিগুরুর সে কথা খাটে না। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে বাঙালি বীরের জাতি। তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মতো বাঁচতে জানে।’ তার জীবন দর্শন থেকে এ কথা উচ্চারিত হয়েছে, এই রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ থাকবে না। এই রাষ্ট্র মানুষের হবে। তাদের মূলমন্ত্র হবে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘বাংলা মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নাই। মুসলমান,হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃস্টান বাংলাদেশে যারা বসবাস করেন তারা সকলেই এদেশের নাগরিক। সকল ক্ষেত্রে তারা সমঅধিকার ভোগ করবেন।’ এভাবে বাঙালির মর্যানার স্থান প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়ে ইতিহাসের গৌড়, বঙ্গকে বাংলাদেশ করে বিশ্বের সামনে বাঙালির পরিচয়কে সার্বভৌমের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করলেন সার্বভৌম শেখ মুজিবুর রহমান। এই সূত্র ধরে উল্লেখ করতে হয়, বাংলা সাহিত্য বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর মননশীল চিন্তা। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘ সাহিত্য,সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে আমরা দরিদ্র নই। আমাদের ভাষার দুহাজার বছরের একটি গৌরবময় ইতিহাস আছে। বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার সমৃদ্ধ। আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্কর। আজকে স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মর্যাদাকে দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আমি সাহিত্যিক নই, শিল্পী নই কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনোভাবে কোনো মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না। আমি সারাজীবন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রাম করেছি, এখনো করছি, ভবিষ্যতে যা কিছু করবো জনগণকে নিয়েই করবো। সুধী বন্ধুরা, আপনাদেও কাছে আমার আবেদন- আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি যেন শুধু শহরের পাকা দালানেই আবদ্ধ হয়ে না থাকে। বাংলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরের কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দনও তাতে প্রতিফলিত হয়। আজকের সাহিত্য সম্মেলনে যদি এ সবের সঠিক মূল্যায়ন হয় তবে আমি সব চেয়ে বেশি আনন্দিত হবো।’
বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণে নিজের দেশের শিল্প সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। সেই সময় তিনি পাননি। সেই সময় তিনি পেলে আজকে বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য বিদেশে যোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো।
এভাবে গণমানুষের মর্যাদাকে সমুন্নত করার কথা বলেছেন। জাতির সাংস্কৃতিক বোধে মনুষ্যত্বের বোধকে প্রতিষ্ঠত করার চিন্তাও তিনি উচ্চারণ করেছেন তিনি। বিশ্বজোড়া মানুষের শান্তিতে থাকার স্বপ্নও ছিল তার মধ্যে। ১৯৭৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেছিলেন। নিজের মাতৃভাষায় বক্তৃতা দিয়ে তিনি বাঙালি জাতিসত্তার দিগন্তকে প্রসারিত করেছিলেন। অন্যদিকে বিশ্বের মানুষের জন্য শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। উদ্বৃতি : ‘ জনাব সভাপতি, আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এইজন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগিদার এই জন্য যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করিতেছে। আত্মনিয়ন্ত্রাণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকারের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী সংগ্রাম করিয়াছে, তাহারা বিশ্বের সকল জাতির সাথে শান্তি ও সৌহার্দ নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্খী ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শেও জন্য ¬সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছে। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা আকাঙ্খা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তার মৃত্যদিবস শারীরিক মৃত্যুর সত্য। ইতিহাসে তিনি মৃত্যুহীন অমর মানুষ। তার জন্ম না হলে বাঙালির হাজার বছরের উপেক্ষার জায়গাটি প্রশমিত হতো না। বাঙালি বিশ্বজুড়ে বাঙালি হয়ে উঠতে পারত না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যদিন-জন্মদিন বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট বাঁকবদলের ইতিহাস। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের ‘খবীকৃত’ ভূখণ্ড নয়। বিশ্বের মানচিত্রে অবিনাশী নাম উচ্চতায় বিশ্ববাসীর সামনে মাথা তুলেছে।
বিশ্বের সব মানুষের আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়নের সঙ্গে তিনি বাঙালি জাতিকে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছেন। এই প্রতিশ্রুতি থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতন-নিপীড়ন-গণহত্যাসহ মানবাধিকার লংঘনের প্রতিবাদে বাঙালির এগিয়ে চলার পথ প্রদর্শক হিসেবে অভিভাবকের দায়িত্¦ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মানবতার বার্তাটি ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের সামনে থেকে মুছে দেননি। এখানেই বঙ্গবন্ধুর জাতি সংঘের পূর্ণতর রূপ উঠে এসেছে। বিশ্ব তাকিয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের দিকে। তাকে বাংলাদেশের সাহিত্যে অনবরত স্মরণ করছেন দেশের লেখকরা।
শিশু সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খানের একটি কবিতার নাম ‘মুজিব’। উদ্বৃতি :
সবুজ শ্যামল বনভূমি মাঠ নদীতীর বালুচর
সবখানে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঘর।
সোনার দেশের মাঠে মাছে ফলে সোনাধান রাশি রাশি
ফসলের হাসি দেখে মনে হয় শেখ মুজিবের হাসি।
শিশুর মধুর হাসিতে যখন ভরে বাঙালির ঘর,
মনে হয় যেন শিশু হয়ে হাসে চিরশিশু মুজিবুর।
আমরা বাঙালি যতদিন বেঁচে রইব এ বাংলায়
স্বাধীন বাংলা ডাকবে : মুজিব আয় ঘরে ফিরে আয়।

তিনি বাঙালির জীবনে হিরন্ময় জ্যোতি। ইতিহাসের পাতায় তার অবস্থান বঙ্গ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা। সংকর বাঙালি তার নেতৃত্বে আজ জাতিসত্তার মর্যাদায় আসীন।

সেলিনা হোসেন : কথাসাহিত্যিক




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top