বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি | শোকাবহ আগস্ট | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮
শোকাবহ আগস্ট

বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি

মোজাফফর হোসেন পল্টু

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২১ ০০:১৮ আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২১ ০১:০৯

মোজাফফর হোসেন পল্টু | প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২১ ০০:১৮


অলংকরণ : রাজিব হাসান

বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে দীর্ঘদিন ছিলাম বলে তাঁকে নিয়ে অনেক স্মৃতি। সেই স্মৃতি কখনও মধুর আবার বেদনার। সুখস্মৃতি যেমন আনন্দ দেয়, বেদনা মনকে বিষন্ন করে। ছোট পরিসরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা প্রায় অসম্ভব।
বঙ্গবন্ধুকে আমি সর্বপ্রথম দেখি মনে হয় ১৯৫৩ সালে। তখন আমি শান্তিনগরে থাকতাম। সে সময় ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন মরহুম গাজী গোলাম মোস্তফা। বঙ্গবন্ধু প্রায়ই একটা জিপে করে গাজী গোলাম মোস্তফার বাসায় আসতেন। গাজী গোলাম মোস্তফা সাহেবের বাসা ছিল গলির একটু ভিতরে। কবি গোলাম মুস্তাফা ও হাবীবুল্লাহ বাহার সাহেবের বাসার মাঝখান দিয়ে যে রাস্তা সেটা দিয়ে বঙ্গবন্ধু গাজী সাহেবের বাসায় যেতেন। অনেক সময় দেখতাম- বঙ্গবন্ধু গাজী গোলাম মোস্তফাকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমরা পাড়ার ছেলেরা ওই রাস্তায় বসে গল্পগুজব করতাম- তখন স্কুলে পড়ি। বঙ্গবন্ধুকে দেখলেই আমরা সালাম দিতাম। উনি আমাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন। সেই সময় আমাদের বন্ধুদের মধ্যে তফাজ্জল ইসলাম (সাবেক প্রধান বিচারপতি) সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কেরামত মওলা, আনোয়ার পারভেজ, রিয়াজ উদ্দিন মানু এবং ড. ওসমান গনীসহ অনেকেই।
১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন একটা মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেখি। সে নির্বাচনে এ এলাকা (কমলাপুর-শান্তিনগর-মতিঝিল) থেকে অভিনেতা সিডনির বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ আলী নির্বাচন করেন। উনার নির্বাচনী ক্যাম্পেইন করতে বঙ্গবন্ধু বেশ কয়েকটি মিটিং করছিলেন। সেই সময় বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছাকাছি দেখি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার আকর্ষণ ছোট বেলা থেকেই ছিল। আমি অনেক সময় স্কুল ফাঁকি দিয়ে পল্টন ঈদগাহ্ মাঠে যেতাম। তখন ওখানেই মিটিং হতো। সেই মিটিংয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতারা বক্তৃতা করতেন। আমি বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে থাকতাম। মুজিব ভাইয়ের বক্তৃতা শেষ হলে আমি চলে আসতাম। নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসল। কিন্তু ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ এবং মাওলানা ভাসানীর ও সোহরাওয়ার্দী ও মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে কিছু মতানৈক্য হলো। তখন সোহরাওয়ার্দী সাহেব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হলো এর জের ধরে। আমার মনে আছে ভাঙ্গাভাঙ্গির এই সময়ে পুরোনো ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলের সামনে বেশ গন্ডগোল হয়েছিল। আমি তখন কে এল জুবিলী স্কুলের ছাত্র। অত:পর আমি কলেজে ভর্তি হলাম। অনেকদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয় না। এর মধ্যে আইয়ুবের সামরিক শাসন আসলো। অনেক চড়াই উৎরাই পার হলো। সোহরাওয়ার্দীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করা হলো। খুব সম্ভব ১৯৬০ সালে বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে দেখি। সেগুনবাগিচা বাজারের সামনে ট্যাক্স ডিসিসন অফিসের পাশে- একটা দোতলা বাড়িতে তিনি ছিলেন। আমি আর আমার বন্ধু ভয়েস অব আমেরিকার ইকবাল বাহার চৌধুরী হেঁটে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম বঙ্গবন্ধু একটা লুঙ্গি আর হাওয়াই শার্ট পরে বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা উনাকে সালাম দিলাম। ইকবালকে তিনি চিনতেন। ইকবাল ছিল হাবীবুল্লাহ বাহার সাহেবের ছেলে। হাবিবুল্লাহ বাহার ছিলেন কলকাতার মুসলিম লীগ নেতা। বঙ্গবন্ধু ইকবালকে জিজ্ঞেস করলেন- তোমার বাবার শরীরের অবস্থা কী? হাবিবুল্লাহ বাহার সাহেব তখন অসুস্থ। কথা বলতে পারেন না। কবি নজরুলের মতোই বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। ইকবাল বলল, আব্বা ভালো আছেন। তারপর জানতে চাইলেন, তোমার মা কেমন আছেন? ইকবালের মা ছিলেন বাংলাবাজার গার্লস স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। ইকবাল বলল, ভালো আছেন। বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন- এই তুই কেমন আছিস? আমি বললাম, আছি। এই কথা বলে আমরা চলে এলাম। এর মধ্যে অনেকদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগযোগ ছিল না।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মাসিক ‘বর্ণালী’ নামে পত্রিকা বের করি। বঙ্গবন্ধু তখন আলফা ইন্স্যুরেন্সে বসতেন। ওখানে গাজী গোলাম মোস্তফা সাহেব বসতেন। মোহাম্মদ হানিফ বসত। হানিফের বড় দুই ভাই সুলতান সাহেব ও মজিদ সাহেবও বসতেন। আমি একদিন ওখানে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করলাম।
তিনি আমাকে বললেন- এই তুই কেনো আসছিস? আমি বললাম, একটা পত্রিকা বের করি। আমাকে একটা বিজ্ঞাপন দেন। আমি বিজ্ঞাপনের জন্য আসছি। বঙ্গবন্ধু হেসে দিলেন। আমাকে একশ টাকার একটা বিজ্ঞাপন দিলেন। অ্যাকাউনটেন্টকে ডেকে বললেন- “ওকে টাকাটা এডভান্স দিয়া দাও। পত্রিকা ছাপতে কাগজ লাগবে। ওতো ছাত্র। কাগজ কিনার টাকা পাবে কোথায়?” এই যে তাঁর আন্তরিকতা ও স্নেহসুলভ আচরণ এর তুলনা হয় না। ১৯৬৩ সালে একশ টাকার অনেক দাম। আমি বিজ্ঞাপনটা নিয়ে চলে আসলাম। এরপর আস্তে আস্তে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার আরো ঘনিষ্ঠতা হলো। আমি একদিন বঙ্গবন্ধুকে ভীষন রাগান্বিত হতে দেখেছি। বঙ্গবন্ধুকে এমন রাগতে কখনও দেখিনি। আমরা তখন আওয়ামী লীগ অফিসে বসা। ১৯৬৪ সাল হবে। উনি এসেই চিৎকার করে বললেন- “তোমরা এখনও বসে আছো কেন? মানুষ মেরে শেষ করে ফেলল। কীসের হিন্দু, কীসের মুসলমান। আমরা মানুষ। কাল আমি রাস্তায় বের হবো। মিছিল অ্যারেঞ্জ করো।” পরদিন ‘বাঙ্গালি রুখিয়া দাঁড়াও’ এই লিফলেট নিয়ে আমরা বের হলাম- বঙ্গবন্ধুর পেছনে পেছনে। আওয়ামী লীগ অফিসে প্রায়ই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা হতো। একদিন বঙ্গবন্ধু আমাকে ডাকলেন, বললেন- “তোকে আওয়ামী লীগ করতে হবে”। গাজী সাহেবকে ডাকলেন, বললেন- “মোস্তফা (গাজী সাহেবকে কখনও মোস্তফা কখনও গাজী দু‘নামেই ডাকতেন) তোর সঙ্গে ওকে নিয়ে নে, ও সিটি আওয়ামী লীগ করবে।” তখন কাউন্সিল হচ্ছিল। আমাকে কমলাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পাবলিসিটি সেক্রেটারী করা হয়। তখন ওয়ার্ড ছিলনা, ইউনিয়ন ছিল। আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগে যোগ দেই। সেই থেকে আমার আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং ক্যারিয়ার গড়া। পরবর্তীতে আমি কমলাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী হলাম। গাজী সাহেব সিটির জেনারেল সেক্রেটারী আবার কমলাপুর ইউনিয়নেরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে আমি প্রেসিডেন্টও হই। ১৯৬৪ সাল। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান নির্বাচন দিলেন। প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে সেদিন বঙ্গবন্ধুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মিলে কম্বাইন্ড অপজিশন “কপ” করলেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে আইয়ুবের বিরুদ্ধে দাঁড় করালেন। সেই সময় আমরা যারা এদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, প্রগতিশীল আন্দোলনে জড়িত ছিলাম সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন করেছি। শুধু তাই নয় অনেক নির্যাতন নিষ্পেষনের মধ্যে দিয়েও আমরা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দলনরত ছিলাম। একদিন জোনাকি সিনেমা হলের সামনের রাস্তার উপর এক জনসভা হলো। সভায় এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান ও আজম খান, কাউন্সিল মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হলেন। সভা পরিচালনা করার দায়িত্ব পড়ল আমার উপর। আমি সেই সভা পরিচালনা করার কাজ শুরু করলাম। আমার হাতে যে কাগজটা দেওয়া হলো তাতে দেখলাম বক্তাদের লিস্টে আমাদের মুজিব ভাইয়ের নাম নেই। এটা দেখে আমি অবাক, বিস্মিত শুধু হলাম না, ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাম। আমি বললাম, মুজিব ভাইয়ের নাম নাই এ সভা আমি পরিচালনা করব না। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম পিছন দিক থেকে কে যেন আমাকে থাপ্পর দিল। আর বলল-“যা লেখা আছে তাই পড়ো। বেশি বোঝার চেষ্টা করো না।” পিছনে ফিরে দেখলাম মুজিব ভাই আমার পিঠে থাপ্পর দিয়ে এই কথাগুলো বললেন। আমি সেদিন বুঝলাম মুজিব ভাই নিজেকে ফলাও করার জন্য কোন কিছু করেন না। আমি বিভিন্ন সময় দেখেছি, সেদিনও দেখলাম- এই যে কম্বাইন্ড অপজিশন-সম্মিলিত জোটটা যাতে ঠিক থাকে সেজন্য নিজের নামটা বক্তার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে অন্যকে দিলেন। তখন অবশ্য আমার এ বুঝটা ছিল না যে, কম্বাইন্ড অপজিশনে এক দল থেকে একজনকেই বক্তৃতার সুযোগ দেয়া হয়। নির্বাচনে জয়লাভই বড়, এটা আমি মুজিব ভাইয়ের মধ্যে দেখেছি। এ কারণেই সেদিন যখন আমি এটা বলেছিলাম, তখন পিছন দিক থেকে আমাকে ধমক দিয়েছিলেন। এটা এখনও আমার কানে বাজে- “যা লেখা আছে তাই পড়ো। বেশি বোঝার চেষ্টা করো না।”
১৯৭৩ সাল। তখন খেলাধুলার মাঠে আমার খুবই পদচারণা ছিল। সাংগঠনিক ভাবে আমি ক্লাব করেছি। অনেকগুলো ক্লাব আমি চালিয়েছি। একদিন রাত দশটার দিকে আমি আওয়ামী লীগ অফিস থেকে বেড়িয়ে স্টেডিয়ামে গিয়ে আবাক হয়ে যাই। হাশেম ভাই, ফুটবল ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারী-ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, কনগ্রাচুলেশন। আমি বললাম, কেনো? তিনি বললেন- তুমি তো বিদেশ যাচ্ছো। আমি বললাম- কে বলেছে আপনাকে। আমি তো কিছুই জানি না। তিনি বললেন- মনু আসছিল খেলা দেখতে মাঠে (মনু মানে টাঙ্গাইলের মান্নান সাহেব)। উনি আমাকে ডেকে বললেন আজকে একটা ঘটনা ঘটলো। “আমি বঙ্গবন্ধুর ওইখানে বসা। এর মধ্যে একটা ফাইল পাঠাইছে ইউসুফ আলী সাহেব। জিজিআর- এ একজন স্পোর্টস অর্গানাইজার যাবে। তিন সপ্তাহের একটা ডিপ্লোমা কোর্স আছে। তা ফাইলটা পইড়া বঙ্গবন্ধু আমারে বলল- ইউসুফ দেখ, একজন ডেপুটি সেক্রেটারী পাঠাচ্ছে। ও গিয়া ওইখানে কী করবে? আমাদের লোক না থাকলে একটা কথা। এই পল্টুর পুরা নাম কি বল। উনি পল্টুর পুরা নাম না লিইখা শুধু পল্টু লিইখা পাঠাইয়া দিছে।” এতে বোঝা যায় যে, কতদিকে বঙ্গবন্ধুর খেয়াল ছিল। এ ঘটনায় ইউসুফ আলী সাহেব একটু মনঃক্ষুন্ন হন। উনি ভেবেছেন আমি বুঝি তদবির করেছি। যেহেতু কাজী আনিসুর রহমান তখন বাংলাদেশ ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক ছিলেন, তার সামনেই মান্নান ভাই কথাটা বলেছেন। তখন ইউসুফ আলী সাহেব আনিসুর সাহেবকে বললেন- পল্টু আমাকেই বললে পারতো। তখন কাজী আনিস বললেন, স্যার আপনি ভুল করছেন। মান্নান সাহেব আমাদের সামনে বলছেন। পল্টু তো জানতোই না কিছু। এ রকম অনেক স্নেহ-ভালোবাসা আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছি। আমি তখন ব্যাচেলার। সারাদিন দৌড়াদৌড়িতেই সময় কাটে। আজ এখানে ঘুমাই তো কাল ওখানে। একদিন বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। উনার রুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ভীষন রাগ। “তুমি কোথায় থাকো। তুমি সিটির সেক্রেটারী। তোমাকে ডিসি খুঁইজা পায় না, এসপি খুঁইজা পায় না”। বঙ্গবন্ধুর রাগ দেখে ঘাবড়ে গেলাম। তখন ডিসি ছিল রেজাউল হায়াত আর এসপি ছিল মাহবুব উদ্দিন। কোন একটি ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে গেছেন উনারা। বঙ্গবন্ধু বললেন- পল্টুর সঙ্গে আলাপ করো। ওরা তো আমাকে খুঁইজা পায় না। ওরা বঙ্গবন্ধুকে বললেন- স্যার উনাকে তো ট্রেস করতে পারছি না। বঙ্গবন্ধু উনাদের খুব বকা দিলেন। বকা দিলেন আমাকেও। বললেন-“আমি সোহরাবকে (পূর্তমন্ত্রী) বলে দেই তুমি একটি অ্যাভান্ডেন্ড বাড়ি নিয়ে নাও।” আমি বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বললাম- বঙ্গবন্ধু...। বঙ্গবন্ধু বললেন- “কি হয়েছে”। আমি বললাম, সোহরাব সাহেব আমাকে সাধছে। আমি নেই নাই। বাড়িগুলো যাদের ছিল ওরা পিন্ডিতে যাক লাহরে যাক- ওদের দীর্ঘনিঃশ্বাস আছে এর মধ্যে। উনি এই ব্যাপারটাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করলেন। বললেন- “তোর মতো যদি আমার সব জেলার সেক্রেটারী (তখন ১৯টি জেলা ছিল) এরকম হতো তাহলে তো ভালোই ছিল।” আমি বললাম- আমি বাসা ভাড়া নিচ্ছি। আমার বাবার বাসা ছিল তখন শান্তিবাগে। সেখানে গলির মধ্যে ভিড়বাট্টা বেশি হয় বলে আমার বন্ধু ডাক্তার ওসমানের নয়াপল্টনের বাসায় আমি থাকতাম। ওই বাসার উল্টোদিকেই গাজী সাহেব থাকতেন। আমার জন্য এই বাসাটা ভালোই ছিল। কেননা গাজী সাহেব ছিলেন সিটি সভাপতি আর আমি সেক্রেটারী। রাত বিরাতে বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে উনার সঙ্গে কথা বলা যেত। পরে আমি পল্টনে এজি অফিসের বিপরীতে মনোয়ারা কিন্ডারগার্টেনের পাঁচ তলায় বাসা ভাড়া নেই।
আরেকটি ঘটনা। যা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। দেখা গেল বাজেটে স্পোর্টস গুডসের উপর হানড্রেড পার্সেন্ট এবং ক্রিকেট গুডসের উপর হানড্রেড থার্টি পার্সেন্ট ট্যাক্স বসানো হলো। এটা দেখে সমগ্র ক্রীড়াঙ্গনে একটা ক্ষোভের সঞ্চার হলো। দেখা গেল ক্রিকেট প্লেয়াররা প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে ক্রিকেট ব্যাট, প্যাড ইত্যাদি পোড়াতে লাগল। ডেমোস্ট্রেশন দেয়া শুরু করল। এরকম একটা সময়ে হঠাৎ করে শেখ কামাল আমার বাসায় আসল। আমাকে বলল, দেখছেন প্রেস ক্লাবের সামনে ক্রিকেটার, স্পোর্টসম্যানরা ডেমোস্ট্রেশন করছে। আমি বললাম, আমি দেখি নাই। আমি শুনেছি। ও বলল, এখন কি হবে। আমি বললাম, তুমি তোমার আব্বার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলো। কামাল আমাকে বলল, না না। আমি বলতে পারব না এ কথা। এটা আপনাকে গিয়েই বলতে হবে। এবং আপনি আজকেই আব্বার সঙ্গে দেখা করেন। যাই হোক। আমার তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে কখনও কোনো অসুবিধা ছিল না। কোনো পারমিশনের প্রয়োজন ছিল না। আমি গিয়ে হাজির হলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে।
বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে বললেন, কিরে তুই হঠাৎ করে এসেছিস। কোনো কিছু হয়েছে নাকি? আমি খুব আমতা আমতা করে বললাম, না কিছু কথা আছে আপনার সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু বললেন, কি হয়েছে বল পরিষ্কার করে। আমি বললাম, বঙ্গবন্ধু স্পোর্টস গুডসের উপর তো হানড্রেড পার্সেন্ট ট্যাক্স বসানো হয়েছে এবং ক্রিকেট গুডসের উপর হানড্্েরড থার্টি পার্সেন্ট ট্যাক্স বসানো হয়েছে। এখন তো ছেলেরা বিক্ষোভ করছে। ক্রীড়াঙ্গনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, “দেখ আমি এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। তবে আমি এইটুকু বলি তোকে, তুই তাজউদ্দিনের সাথে দেখা কর। তাজউদ্দিন তোকে ভালোই জানে।”
আমি বললাম, তাজউদ্দিন ভাই কি আমাকে এই ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। বঙ্গবন্ধু বললেন- “তাজউদ্দিনকে আমার পক্ষে বলা সম্ভব হবে না। কারণ আমি কিছু বললে তাজউদ্দিন কষ্ট পাবে। ভাববে আমি বোধ হয় হস্তক্ষেপ করছি। সুতরাং এটা তোকেই বলতে হবে।” বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিয়ে আমি বেরিয়ে আসলাম। চিন্তা করলাম এভাবে গিয়ে বলা যাবে না। তাজউদ্দিন সাহেবকে আমি যতটুকু দেখিছি, জেনেছি তা থেকে আমার এই ধারণা। আর এটা বাজেটের ব্যাপার। আমি এভাবে বলতেও পারি না। আমি চিন্তু করলাম কি করা যায়। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। আমি তখন ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার জেনারেল সেক্রেটারী। সেবার ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থা ভলিবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমি চিন্তা করলাম আমাদের দলের প্লেয়ারদের ব্লেজার দিব এবং ওই অনুষ্ঠানে তাজউদ্দিন সাহেবকে প্রধান অতিথি করে আনব। তখন পদাধিকার বলে জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর সভাপতি ছিলেন ডিসি। আমি ঢাকার ডিসি কামাল উদ্দিন সাহেবকে ফোন করলাম। উনি বললেন, কি খবর। আমি বললাম, কামাল ভাই একটা কাজে আপনাকে ফোন করলাম। আমাকে তো কিছু টাকা দিতে হবে। উনি জানতে চাইলেন, কী করবেন টাকা দিয়ে।
আমি বললাম, আমরা তো ভলিবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, ছেলেদের ব্লেজার দিতে হবে। উনি বললেন, কত টাকা লাগবে। আমি কত টাকার কথা বলেছি এখন মনে নাই। উনি বললেন, ঠিক আছে। অসুবিধা হবে না। যথারীতি ব্লেজার তৈরী করে অনুষ্ঠানের সবকিছু ঠিকঠাক করে তাজউদ্দিন সাহেবের কাছে গেলাম। আমি উনাকে সালাম দিলাম। উনি বললেন, কী খবর তোমার। ভালো আছো। দেখলাম উনার মুডটা খুব ভালো। আমি বললাম, তাজউদ্দিন ভাই আপনি তো ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের মিনিস্টার। উনি বললেন, আমি কেন ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের মিনিস্টার হবো। আমি তো সারা বাংলাদেশের মিনিস্টার। আমি বললাম, যাই হোক। ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট থেকেই তো আপনি নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী হয়েছেন। উনি হেসে বললেন, কথাটা তো একদিক দিয়ে ঠিকই বলেছ। তো কি সমাচার? তুমি কি বলতে চাও? আমি বললাম, আমরা ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট ভলিবলে এইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তা দলের প্লেয়ারদের ব্লেজার দিব। সেই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাকে চিফ গেষ্ট করতে চাই। উনি হেসে দিলেন। এবং রাজী হলেন। উনাকে চিফ গেস্ট করে ঢাকার আর যারা মন্ত্রী ছিলেন - শামসুল হক সাহেব চীফ হুইপ, শাহ মোয়াজ্জেম, মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়াসহ মোটামুটি ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের যারা ছিলেন এদের সবাইকে দাওয়াত দিলাম। এদিকে আমি ক্রীড়াঙ্গনের সিনিয়ার অর্গানাইজার যারা ছিল - যেমন ওয়ারী ক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারী হাসেম সাহেব, ভিক্টোরিয়া ক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারী শহিদুর রহমান কচি ভাই, নুরুজ্জামান সাহেব, ভলিবলের খবির সাহেব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ওয়াজেদ ভাই এবং ফায়ার সার্ভিসের ডিরেক্টর সিদ্দিকুর রহমান সাহেব, মইনুল ইসলাম সাহেব, ইস্ট এন্ড ক্লাবের খালেক সাহেব, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সাইফুদ্দিন আহমেদসহ আরও যারা সে সময়ে ক্রীড়াঙ্গনে ভালো অর্গানাইজার ছিলেন সবাইকে দাওয়াত দিলাম। মোহামেডান ক্লাবের গজনবী ভাইকেও দাওয়াত দিলাম। আমি আগেই সবার সঙ্গে কথা বলে রেখেছি যে আপনাদের স্পোর্টসগুডসের উপর ট্যাক্স কমানোর ব্যাপরে জোরালো বক্তব্য রাখতে হবে। কোনো অসুবিধা হবে না । আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি আপনারা বক্তব্য রাখবেন। বঙ্গবন্ধু তো আমাকে বলেছেন তাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে। ওটার একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্যই এই উদ্যোগটা নিলাম। অনুষ্ঠানে সবাই আসল। তাজউদ্দিন সাহেব আসলেন। উনি দেখলেন এখানে উনার পরিচিত অনেকেই আছেন। স্পোর্টস অর্গানাইজাররা জোরালো বক্তব্য দিলেন। তাজউদ্দিন সাহেব স্পোর্টস গুডসের উপর হানড্রেড পার্সেন্ট ট্যাক্স রহিত করলেন। কিন্তু ক্রিকেটে থার্টি পার্সিন্ট রেখে দিলেন। যাই হোক পরদিন আমি বঙ্গবন্ধুৃর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে দেখেই বঙ্গবন্ধু মুচকি মুচকি হাসছেন। আমি সালাম দিলাম। “আমাকে বললেন, তুই ভালোই করেছিস। এই জন্যই তোকে বলেছিলাম তুই কথা বলিস। তুই যেভাবে কাজটা করেছিস আমি তোর উপর খুব খুশি হয়েছি। তোর বুদ্ধি আছে। আমি তখন ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সেক্রেটারী। আমি বললাম, ক্রিকেটের উপর তো থার্টি পার্সেন্ট রেখে দিল। বঙ্গবন্ধু বলেলেন, এটা নিয়া চিন্তা করিস না। আমি ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে অ্যাডহক লাইসেন্স দিয়ে দিব। এই লাইসেন্সের ভিত্তিতে ক্রিকেট গুডস আনবি এবং সারা দেশের স্কুল, কলেজ, ক্লাব সবখানে ডিস্ট্রিবিউশন করে দিবি। কোনো অসুবিধা হবে না।” তখন বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থার আহ্বায়ক ছিলেন কাজী আনিসুর রহমান। ক্রিকেট নিয়ে তখন অনেকে অনেক কথা বলেছিল। কেউ কেউ বলেছিল ক্রিকেট ইজ এ গেম অব লর্ড। সমাজতান্ত্রিক দেশে ক্রিকেটের প্রয়োজন হবে না। ক্রিকেটের উপর যে বিরাট বাধা এসেছিল বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতা ও সহযোগিতায় সেদিন আমরা এই বাধা অতিক্রম করতে পেরেছিলাম। এ ব্যাপারে শেখ কামালের জোরালো ভূমিকা ছিল। এই যে আজ বাংলাদেশ ক্রিকেট এমন একটা পর্যায়ে গেছে, খ্যাতি লাভ করেছে-এটা দেখে মনে খুব আনন্দ পাচ্ছি। যখন খেলা দেখতে যাই কিংবা কাগজে দেখি ছেলেরা ভালো খেলছে, তখনই বঙ্গবন্ধুর চেহারা-তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের দৃশ্য আমরা মনে পড়ে যায়। এই মধুর স্মৃতিগুলো আমাকে যেমন আনন্দ দেয় তেমনি হৃদয়ে বেদনারও সৃষ্টি করে-বঙ্গবন্ধুকে হারানোর বেদনা।

বঙ্গবন্ধু আমাকে অসম্ভব পছন্দ করতেন। তিনি সুযোগ পেলেই আমাকে লিফট্ দিতেন। তিনি আমাকে সিটি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বর করলেন। ৭৪ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে আমাকে মহানগরের সাধারণ সম্পাদক করে দিলেন। আর তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠতা বেড়ে গেল।
সাংগঠনিক কারণে প্রায়ই আমাকে ডেকে পাঠাতেন। রাত বারোটায়ও উনার কাছে যেতে পারতাম আমি। একদিন বাচ্চু মিয়া নামে চকবাজারের এক লোক (চায়ের দোকানদার) আমার কাছে আসল। আমি তখন আওয়ামী লীগ অফিসে। আমি বাচ্চু মিয়াকে জিজ্ঞেশ করলাম, ব্যাপার কী? বাচ্চু মিয়া বলল, “আমার পোলাটারে পুলিশ ধইরা লইয়া গেছে। আমি বললাম, কেন? ও বলল, পুলিশ কয় কি সিগারেট নাকি বেলাক করতাছে।” আমি বললাম, দেখো বাচ্চু মিয়া, আমি তো এই ব্যাপারে কিছু করতে পারব না। তুমি তো আওয়ামী লীগ করো। কদিন পর আবার এসেছে বাচ্চু মিয়া। এবার বলল, পল্টু সাব, আমারে একটু বঙ্গবন্ধুর লগে দেখা করাইয়া দিবেন। বঙ্গবন্ধুরে খুব দেখবার মন চাইছে। আমি বললাম, তুমি গিয়া কইবা আমার পোলারে ধইরা লইয়া গেছে। বাচ্চু মিয়া বলল, আমি যদি এই সব কোনো কথা কই তো আমারে কুত্তার লগে ভাত দিবেন। আমি বললাম, তাইলে তুমি বহো। আমি ওকে বসতে দিলাম। আমি কাজটা সেরে আমার গাড়িতে করে বাচ্চু মিয়াকে ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে নিয়ে গেলাম। বাচ্চু মিয়াকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে উপরে গেলাম। আমি দোতলায় উঠেই দেখি ভাবী (বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব) নিজেই শর্তা দিয়ে সুপারি কাটছেন। কত সিম্পল ছিলেন বেগম মুজিব। আমাকে দেখে হেসে বললেন, “ আপনে পুব দিকে রওনা দিয়া পশ্চিম দিকে আইছেন?” আমি ব্যাচেলর ছিলাম উনি জানতেন। জিজ্ঞেস করলেন, খাইছেন? আমি বলালাম, না খাই নাই। লিডার কি ঘুমাইয়া গেছেন? ভাবী বললেন, না, এইমাত্র গেছেন। আপনে যান। আমি রুমে গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধু বালিশে হেলান দিয়ে পাইপ টানছেন। আমি সালাম দিলাম। আমাকে দেখে বললেন, কীরে তুই কি খবর নিয়া আসছিস? আমি বললাম, না কিছু কথা ছিল। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাংগঠনিক কথা সেরে নিলাম। আলাপ শেষে বললাম, বঙ্গবন্ধু চকবাজারের চা দোকানদার বাচ্চু মিয়া আসছে। বাচ্চু মিয়ার কথা শোনে বঙ্গবন্ধু হেলান দেয়া থেকে উঠে বসলেন। কীরে বাচ্চু মিয়ার কী হয়েছে। বাচ্চু মিয়া আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। উনি উদগ্রীব হয়ে বললেন, তুই বাচ্চু মিয়ারে কোথায় পেলি। আমি বললাম, আমি বাচ্চু মিয়াকে নিয়ে আসছি। ও আমার গাড়িতে আছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, না তুই বস। আমি বাচ্চু মিয়াকে আনাচ্ছি। ‘এই কে আছিস। পল্টুর গাড়িতে বাচ্চু মিয়া বলে একটা লোক আছে ওকে ডেকে নিয়া আস।’ বাচ্চু মিয়া আসার সময়টুকুতে বঙ্গবন্ধু বাচ্চু মিয়া সম্বন্ধে অনেক কথা বললেন। তুই জানিস, এই বাচ্চু মিয়া আমার অনেক সময় রিকশা ভাড়া দিয়েছে ওর ক্যাশ থেকে নিয়ে। তারপর কত চা খেয়েছি। কত কি করেছি। কখনও কোনো কিছুতে আপত্তি করেনি। শুধু কি আমরা। আমাদের কর্মীরা ওর দোকান থেকে কত চা-বিস্কুট খেয়েছে। কখনও না করেনি। বঙ্গবন্ধুর কাছে শুনে বুঝলাম বাচ্চু মিয়া লোকটা আপাদমস্তক আওয়ামী লীগের কর্মী। বঙ্গবন্ধুকে দেখে বাচ্চু মিয়া হাউমাউ করে কাঁদছে। বঙ্গবন্ধু তাঁকে জড়িয়ে ধরে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছেন। এ দৃশ্য না দেখলে বিশ^াস করা যাবে না। তারপর বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন, অমুক কেমন আছে তমুক সরদার কেমন আছে। বঙ্গবন্ধু এক এক করে ধরে ধরে সবার খোঁজখবর নিলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে অতীতের সবকিছু যেন টেলিভিশনের পর্দার মতো ভেসে উঠছে। আমার কাছে মনে হলো এটা একটা আবাক কান্ড! অলৌকিক ব্যাপার! তারপর আবার বাচ্চু মিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পোলপানরা কি করে তা তো বললে না কিছু? বাচ্চু মিয়া বলল, না আছে। আমি দেখলাম যে লোকটা বেকায়দার পড়ে গেছে। আমাকে কথা দেওয়ায় সে সত্যি কথাটা বলতে পারছে না। আমি তখন বললাম, বাচ্চু মিয়ার একটা ছেলে বোধ হয় সিগারট টিগারেট কি জানি বেচত-পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু একটা দীর্ঘশ^াস ছেড়ে বললেন, পুলিশ তো আর স্মাগলার ধরতে পরবে না। ছোটোখাটো এদেরকেই ধরবে। আমাকে বললেন, তুমি মাহবুবকে বলে দিও। বাচ্ছু মিয়াকে বললেন, বাচ্চু মিয়া তুমি বসো। বঙ্গবন্ধু ভিতরে গেলেন। কিছু টাকা নিয়ে এসে (কত টাকা আমি জানি না) বাচ্চু মিয়াকে দিয়ে বললেন, বাচ্চু মিয়া এটা রাখো। বাচ্চু মিয়া বলল, তওবা সাব। সাব আমি টেকার লাইগা আহি নাই। আপনারে এক চোখ দেখবার আইছি। আপনে আমাগো একটা ভালা লোক দিছেন। পল্টু সাব আমগো কথাবর্তা হোনে-আমরা যা কই।
বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি তো এই জন্যই তোমাদের লোক দিয়েছি। বুইঝাই তো দিছি। ঠিক আছে না। না না ঠিক আছে-বলে বাচ্চু মিয়া টাকাটা বঙ্গবন্ধুকে ফেরত দিতে গেলে বঙ্গবন্ধু ধমকে বললেন, নাও এইটা। তোমার যখনই কোনো অসুবিধা হবে পল্টুকে বলো। সে আমাকে জানাবে। কোনোরকম দ্বিধা করবা না। এই যে তাঁর চরিত্রের একটা দিক। তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী। ফাদার অব দ্যা নেশন। বাচ্চু মিয়াকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন। কত কথা জিজ্ঞেস করেছেন। পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন। ওর সম্পর্কে আমাকেও অনেক কথা বললেন। তারপর কিছু টাকা এনে এই গরীব মানুষটাকে দিলেন। এই ঘটনাটা আমি আমার স্মৃতিচারণে এইজন্য বললাম-মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর মমত্ববোধ-দেশের শীর্ষ পজিশনে থেকেও, তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না।
১৯৭৪ সালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একটা কৃত্রিম খাদ্য সংকট করা হলো। তখন আমাকে বঙ্গবন্ধু ডেকে বললেন, নোঙরখানা খোলো বিভিন্ন স্পটে স্পটে। তিনি আমাকে বলে দিলেন কীভাবে কী করতে হবে। বললেন, কর্মীদের বলো সমস্ত কিছু অ্যারেঞ্জ করতে। অভুক্ত লোকদের খাবার দাও। বস্তিতে বস্তিতে খাবার পৌঁছে দাও। সে সময় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ ও সিরাজ সিকদারের দল ১৬ ডিসেম্বরকে কৃষ্ণ দিবস এবং গণবাহিনী ঈদের জামাতে আমাদের এমপি গোলাম কিবরিয়া সাহেবকে হত্যা করল-অস্বস্তিকর ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করল। বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে বললেন, ধৈর্যের সঙ্গে সবকিছু করো।
আমার মনে আছে একবার হরতাল হলো। হরতাল ভাঙার জন্য আমি একটা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হলাম। আমি গাড়ি থেকে নেমে বেশ কজন পিকেটারকে তাড়া করলাম। তখন আমার বয়স কম। অনেক সাহস ছিল। বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, কখনো করবা না এটা। ওরা হরতাল করছে ঠিক আছে। ওরা পিকেটিং করছে-ওদের ধরার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, তুমি কেন গেছ। ১৯৭৪ সালেই অনেক কিছু হলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাও হলো। সে সময় আমি আওয়ামী লীগ অফিসে বসা ছিলাম। তখন কামরুজ্জামান সাহেব আমাকে ফোন করে বললেন- এইখানে তো অনেক গোলাগুলি হইতেছে (মনসুর আলী সাহেবের পাশের বাড়িটাই ছিল উনার), কামরুজ্জামান সাহেব একদম শিশুর মতো মানুষ ছিলেন। আমরা যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম তখন বঙ্গবন্ধু বললেন- “আন্দোলন তো জীবনে আমি অনেক করেছি। আমি তো এই রকম কারো বাড়ি ঘেরাও দেই নাই। ওরা কি শিখছে?” একটা ফাদার লি অ্যাটিচ্যুট নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলছেন, “এরা কি শিখছে-কি শিখল-এতদিন তো ওরা আমার সাথেই ছিল। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করেছে- আন্দোলনের তো একটা সিস্টেম আছে- এসব নানা কথাবার্তা বললেন।” আরো বললেন- “ধৈর্য ধরো- দেখা যাক।” তারপর তো অনেক ধরপাকড় হলো-জাসদ আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেল। তারা গণবাহিনী দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মানুষ খুন করল। হামলা লুটতরাজ চালাল। আমি যেহেতু সিটি আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী বঙ্গবন্ধু আমাকে সব সময় সতর্ক করতেন। চারদিকে দৃষ্টি রাখতে বলতেন। আমি তখন রাত তিনটা সাড়ে তিনটায় ঘুমাই। সকালে দেরি করে উঠি। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিল না। ছিল টিএন্ডটি ফোন। সকালে দেখি সমানে ফোন বাজছে। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সবাই আমাকে কংগ্রেচুলেট করছে। কেন জানতে চাইলে কেউ বলল কি ব্যাপার আপনি, কেউ বলল তুমি কিছুই জানো না। আমি বললাম, আমি তো কিছুই জানি না। ওরা বলল, আপনাকে তো জনতা ব্যাংকের ডিরেক্টর করা হয়েছে। কাগজে উঠেছে। কাগজে দেখেই ওরা আমাকে ফোন করেছে। আমি বিকেলে বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে বললাম, বঙ্গবন্ধু এখন কেন আমাকে ব্যাংকের ডিরেক্টর করলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, “বসো আর শোনো”। পকেট থেকে কতগুলো কাগজ বের করলেন। “এগুলো কিসের কাগজ জানিস। সব তদবিরের কাগজ। তুই কি আমার কাছে তদবির করেছিস। আমি জানি তুমি চুরি করবা না। এই জন্যই দিয়েছি।” এই যে বিশ^াস, এই যে স্নেহ-এটা আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। একদিন ইউসুফ আলী সাহেব স্পোর্টস কন্ট্রোল বোর্ডের ফাইল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলেন। ফাইলটা খোলার আগেই বঙ্গবন্ধু বললেন, পল্টুর নাম আছে? ইউসুফ আলী সাহেব বললেন, ওতো ইলেকশন করেই আসতে পারবে। বঙ্গবন্ধু বললেন, “না না। ওর ইলেকশন করার দরকার নাই। ও আমার নমিনী থাকবে। ও আর মইনুল ইসলাম (ওয়ার্কস সেক্রেটারী) ওরা দুইজন আমার নমিনী।” একদিন দুপুরে বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়েছি। গিয়ে দেখি উনি ভাত খাচ্ছেন। আমাকে বললেন, ভাত খেয়েছিস। আমি বললাম, না খাই নাই। বঙ্গবন্ধু বললেন, “খাস নাই। তোর ভাত তো একক্ষণে কামাল, নুরু, টুরুরা (মানে ছাত্রলীগের ছেলেপেলেরা) খেয়ে ফেলেছে।” উনি এ খবরও রাখতেন। তখন আমি ব্যাচেলর ছিলাম। আমি খেতে বসলাম। উনি ততক্ষণে দুই তিনটা কৈ মাছ খেয়ে ফেলেছেন। আমি একটাই খুঁটছি। উনি বললেন, “কীরে খুঁটতে পারছিস না। দে আমি খুঁইটা দেই।” এই যে এতবড় একটা মানুষ, এতবড় মাপের লোক-উনি আমাকে বলছেন দে বাইছা দেই তোর পাতের কৈ মাছটা। কতটা আন্তরিকতা ছিল তাঁর মধ্যে। আরেকদিন বাসায় গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধু একটা সেন্ডো গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরা। আম খাচ্ছেন। উনি কিন্তু আমাদের মতো কাঁটাচামচ দিয়ে আম খেতেন না। আম ছুলে খেতেন। আমি দেখলাম উনার সামনে প্লেটে অনেকগুলো ছোলা আম। আমাকে বললেন, নে আম খা। আমি বললাম, না খাব না। উনি বললেন, “ভদ্রলোক-কাইটা খাইবা। চামচ দিয়া খাইবা?” আমি বললাম, না। আমি এখনও আম খেতে গেলে এইসব স্মৃতি মনে পড়ে। আমি কিন্তু কাঁটাচামচ দিয়ে আম খাই না। ছিলে আম খাই। বঙ্গবন্ধু আমাকে ছাত্রের মতো সিটি আওয়ামী লীগের রাজনীতি শিখিয়েছেন। অনেক সময় তিনি আমাকে ডেকে পাঠাতেন। বলতেন, দেখো এই সিটি আওয়ামী লীগটা আমি আর গাজী অনেক কষ্ট করে করেছি। কখনও গাজী সাইকেল চালিয়েছে আমি সামনে বসেছি। কখনও আমি সাইকেল চালিয়েছি গাজী সামনে বসেছে। এইভাবে আমি আর গাজী বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে লোক জোগাড় করেছি। এইভাবে সংগঠন করেছি। একদিন আমাকে বললেন, “দেখো তোমাকে একটা কথা বলি-কখনও চেয়ারের পিছে দৌড়াবা না। চেয়ার যতক্ষন তোমার পিছে না দৌড়াবে চেয়ার পাবা না। আমাকে দেখো না, আমি কখনও চেয়ারের পিছনে দৌড়েছি। দৌড়াই নাই। আমার চেয়ে কত বড় বড় নেতা ছিল-কই তারা কি চেয়ার পেয়েছে? নিজের সত্ত্বাকে নিয়া রাজনীতি করবা। কারো লেজুরবৃত্তি করে হয়তো সাময়িকভাবে কিছু হালুয়া রুটি পাবা, ক্ষমতা পাবা।” কিন্তু তার মধ্যে কোনো ক্রিয়েটিভিটি কিছু থাকবে না। সৃষ্টির যে একটা আনন্দ সেই স্বাধীনতাটাই থাকবে না। আমাকে আরো বললেন, তোমাকে একটা কথা বলি-এটা রাজনীতির বড় একটা জিনিস। তুমি যদি কাউকে তোমার পক্ষে না আনতে পারো-তাকে যদি নিরপেক্ষও রাখতে পারো, সেটাও তোমার লাভ। বঙ্গবন্ধুর এই কথাগুলো আমি সব সময় মাথার মধ্যে রাখি। বঙ্গবন্ধু ইউসুফ আলীকে একদিন বলছেন- “দেখ তুই তো এডুকেশন ও স্পোর্টস মিনিস্টার, স্পোর্টসটা তুই পল্টুর সাথে কথাবার্তা বলে চালাস। কারণ ও সারাজীবন খেলার মাঠে ছিল। আমি ওকে পিকআপ করেছি খেলার মাঠ থেকেই।” এসব কথা পরে আমাকে ইউসুফ ভাই নিজেই বলেছেন। বঙ্গবন্ধু স্পোর্টস রিলেটেড যে কোনো জায়গায় আমার নামটা দিয়ে দিতেন। অবশ্য এসব কারণে অনেক সময় অন্যদের সঙ্গে একটা ভুল বোঝাবুঝি হতো। আমাকে অনেকে ভুল বুঝতেন। একদিনের ঘটনা। পুরোনো ঢাকার মৌলভীবাজার বণিক সমিতির মাওলানা শাহ্জাহান, নজরুল এসে বলল, পল্টু ভাই আমরা বঙ্গবন্ধুর লগে দেখা করবার চাই। আমাগো কিছু কথাবার্তা আছে। আমি বললাম, আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে তোমাদের টাইম ও ডেট জানিয়ে দেব। বঙ্গবন্ধুকে ওদের কথা বললাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, “ঠিক আছে নিয়ে আসো।” আমি ওদেরকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধু ওদের সবাইকে চিনেন। তিনি উনার স্বভাবসুলভ ভাবে ?




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top