কল্যাণরাষ্ট্রে সোনার বাংলা : বিশাল অর্জন কিন্তু মধ্যস্বত্তভোগীর যন্ত্রণা | শোকাবহ আগস্ট | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮
শোকাবহ আগস্ট

কল্যাণরাষ্ট্রে সোনার বাংলা : বিশাল অর্জন কিন্তু মধ্যস্বত্তভোগীর যন্ত্রণা

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২১ ০০:২৫ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৫:২৫

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন | প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২১ ০০:২৫


প্রায় অর্ধশতাব্দী বয়সে বাংলাদেশের অর্থনীতি শূন্যের কোটা থেকে (মাথাপিছু আয় ৮৫ মার্কিন ডলার, বিশ^ব্যাংক, ১৯৭২) এখন ১৯৮৭ মার্কিন ডলার (আইএমএফ)। সামাজিক রূপান্তরের সাক্ষী হিসেবে গড় আয়ু ৭৩ বছর, শিশুমৃত্যুর হার লক্ষে ৩০ এর কম, বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি শতকরা ১.৩ ভাগ (১৯৭২ সনে শতকরা ৩.৩), প্রাথমিকে ভর্তির হার শতকরা ৯০ ভাগের বেশী, ঝরে পড়ার হার শতকরা ২৫/২৬ ভাগ এবং নিম্নগামী। নারীর সার্বিক প্রজনন ক্ষমতা ১৯৭২ সনে ছিল ৫.২; এখন তা ২.২। বিদ্যুৎ এখন শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষের ঘরে। সুপেয় পানির প্রাপ্যতা শতকরা ৭০ ভাগ ছাড়িয়ে গেছে। পরিবারের সাইজ ৬.২ থেকে ৪.২ এ নেমেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ১৯৭২ সনে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া  ৩০,০০০ এখন ৩৮ লক্ষ। শিক্ষার হার শতকরা ৬৫ কিন্তু এর মান সম্পর্কে দেশে বিদেশে জিজ্ঞাসার অন্ত নাই। ২০০৮ সনে শুরু করা ডিজিট্যাল বাংলাদেশ সুফল দিচ্ছে যার ফলে, কভিড-১৯ এর লন্ডভন্ড পাঠদান বিষয়ে অনলাইন ব্যবস্থা ক্রমপ্রসারমান।

স্বাধীনতার স্বদেশ আগমণ
১০ই জানুয়ারী ১৯৭২ তারিখে স্বাধীনতা অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান বীরের বেশে জাতির পিতা হিসেবে স্বদেশে আসেন। দ্রুতগতিতে সাংবিধানিক পরিবর্তন এনে সরকার প্রধান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হতোদ্যম বাংলাদেশে তখন প্রতিটি ক্ষেত্রে সমস্যার পাহাড় আর ৩০ লক্ষ নারী পুরুষের শাহাদাৎ এবং ০৩ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীর আহাজারী। গুদামে খাদ্য নাই, কিষাণ কিষাণীরা স্বাধীনতা যুদ্ধে তাই মাঠে ফসল নাই। ব্যাংক-বীমা, কল-কারখানা, সদাগরী অফিস বন্ধ কারণ (পশ্চিম) পাকিস্তানীরা এসবের মালিক ছিলেন; তারা পালিয়ে গেছেন নিজ দেশে। রেল, সেতু, রাস্তাঘাট, কালভার্ট, বন্দর, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ধ্বংসপ্রাপ্ত অথবা প্রাণসংহারি মাইনে ভরা। এদিকে পরাজিত শত্রু ও তাদের এদেশীয় অনুচর- গোলাম আযম, জুলমত আলী খান, আব্দুল জব্বার খদ্দর, মৌলনা আব্দুল মান্নান, মৌলনা আতাহার আলী এমনকি একদা প্রগতিশীল মাহমুদ আলীরা প্রচারে নামলেন যে ইসলামী জমহুরি পাকিস্তান (মধ্যপ্রাচ্যের সখা) ভেঙে শেখ মুজিব একটি ধর্ম নিরপেক্ষ হিন্দু প্রভাবিত বাংলাদেশ বানিয়েছেন যেটি ভারতের করদ রাজ্য ছাড়া আর কিছু নয়। শুধু গণচীন বা পাকিস্তান নয়, ইরাক ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সকল স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানালো। ১৯৭২ সনে জাতিসংঘে প্রবেশে গণচীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভেটো প্রয়োগ করলো। হেনরি কিসিঞ্জার ত বটেই , নরওয়ের হিউস্ট ফ্যালান্ড এবং ইংল্যান্ডের অর্থনীতিবিদ জন হেন্ডারসন ফতোয়া দিলেন, ভৌগলিক দিক থেকে টিকে গেলেও একটি সচল অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এত তমসাচ্ছন্ন যে এর বেঁচে থাকা অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে ‘টেস্ট কেইস’ হিসেবে জায়গা করে নেবে। এসকল প্রতিকূলতার মধ্যে জাতির পিতার প্রত্যাবর্তন সমগ্র জাতিকে উচ্চতম আলোর ঝলকানিতে উদ্বুদ্ধ করে।

দৃঢ় পদক্ষেপের সূচনা 

বঙ্গবন্ধুর সরকার একে একে প্রায় যুগপৎভাবে অনেকগুলো কাজ শুরু করে। সংবিধান রচিত হয় নয় মাসে। ধর্মীয় ব্যবসা বন্ধের রাজনীতি আসে তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন স্থাপিত হয়; বন্ধ হয় মদ জুয়া জিমখানা। সংকট মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধু প্রথমদিকে গণখাতের (পাবলিক সেক্টর) উপর নির্ভর করেন তবে ব্যক্তিগত বাজার অর্থনীতির গতিময় দক্ষতার রাস্তাও খোলা রাখেন। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকা অফিসে রক্ষিত ১৮ মার্কিন ডলারের স্থিতি আয় আর কানাডা ও সুইডেনের নগদে বৈদেশিক অনুদানে শুরু হয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্মানজনক স্থিতিতে উঠেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধকালে পলায়নপর পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞে সমষ্টিক অর্থনীতির পরিধি ১৯৭০-৭১ সনে আগের অর্থবছরের তুলনায় শতকরা ৩৫ ভাগ সংকুচিত হয়ে ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারে ধ্বসে যায় (এখন বাংলাদেশের সমষ্টিক আয়, জিডিপি ৩০৪০০ কোটি মার্কিন ডলার)। “সবার সাথে সখ্য কারও সাথে বৈরি নই” নীতিতে যাত্রা শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্র নীতির। তারই পরিমন্ডলে সার্বভৌম স্বাধীনতা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে বৃহৎ ও মহৎ প্রতিবেশী ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনসহ (১৫ই মার্চ ১৯৭২) অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহযোগিতা স্থাপিত হয়। ১৯৭৩ সনে লাহোরে অনুষ্ঠিত অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের মর্যাদাপূর্ণ যোগদান এবং তার আগে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি জাতিসংঘ এবং অন্য সকল বিশ^সংস্থায় যোগদানের পথ উন্মুক্ত করে।

ভবিষ্যতের সুআভাষ

অত্যুক্তির নিন্দার ভয় ছাড়াই একমত হওয়া যাবে যে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্য ঃ সিংহভাগ তরুণই ২০১৯ সনে অর্থনীতির পরিস্থিতিতে (শতকরা ৮০ ভাগ) এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে (শতকরা ৫৩.৭ ভাগ) সন্তুষ্ট (১২ই পৌষ ২৭ ডিসেম্বর) যা ক্রমবর্দ্ধমান। তবে নিরাপত্তা নিয়ে সকলেই চিন্তিত। প্রতি পাঁচ তরুণের চারজনই জীবনের লক্ষ্য নিয়ে চিন্তিত। মনে রাখা প্রয়োজন যে ২০১৯ সনের প্রাক্কলন ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সমষ্টিক আয় জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.১৫ ভাগ। ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেটে বলা হয়েছে যে ২০২৪ সনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই অংক অর্থাৎ শতকরা ১০ ভাগে উন্নীত হবে। বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে আগত রেমিটেন্স বহির্গামী রেমিটেন্সের চেয়ে বেশী বলে মাথাপিছু জিএনআই মাথাপিছু জিডিপির চেয়ে বেশী হয়। ২০২৪ সনে মাথাপিছু জিএনআই ২৫০০ মার্কিন ডলার হবারই কথা - আর বার্ষিক নিট প্রবৃদ্ধি (বার্ষিক জিএনআই প্রবৃদ্ধি থেকে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাদ দিলে) শতকরা ৯ ভাগ হবে। একটি অব্যর্থ লগারিদমিক ফর্মূলা অনুসারে এই পরিস্থিতিতে মাথাপিছু আয় প্রতি ৭.৫ বছরে দ্বিগুণ হবে অর্থাৎ ২০৩১ সনের জুনে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ৫০০০ মার্কিন ডলার এবং ২০৩৯ সনে ১০০০০ (দশ হাজার) মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। সুতরাং ২০৪১ সনে পৃথিবীতে ২৩তম বৃহত্তম অর্থনীতি বাংলাদেশ একটি উন্নত সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে বলে রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ অর্জনযোগ্য বটে।

কতিপয় সতর্কবার্তা

বাংলাদেশ সম্পর্কে যে আশাবাদ গত ১২ বছরে বিশেষ করে অর্থনীতি ক্ষেত্রে প্রবাহমান, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ কাজ সমাপ্তির কাছাকাছি এসে দেশটি বিশেষ করে এর সরকারপ্রধান জনবন্ধু শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতম হয়ে উদ্ভাসিত। অন্যান্য বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প মেট্রোরেল, কর্ণফুলী ট্যানেল এবং পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেকসই উন্নয়নের সোনার বাংলার স্বপ্ন রূপায়নে বৃহৎ বৃহৎ পদক্ষেপ। কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনায় বিশে^র সবচেয়ে সফল ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। আইএমএফ বলছে সমষ্টিক অর্থনীতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে শতকরা ৪.৪ ভাগ যেখানে ১৯টি বাদে সকল দেশেরই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের হিসাব বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার বাংলাদেশে হবে ৬.৮ ভাগ। প্রশ্ন অবশ্যই থাকছে, যদি (ক) জুলাই-ডিসেম্বর ষান্মাসিকে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয় ৩২,৭৫৩ কোটি টাকা, লক্ষ্যমাত্রার শতকরা ২৩ ভাগ কম হয় (খ) ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে থাকে এবং (গ) মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমাদানী হ্রাস পায়, তাহলে বিনিয়োগ ঃ জিডিপি বাড়বে কিভাবে ও কোথা থেকে। আর যদি খেলাপি ঋণগ্রহিতাগণের সুযোগ সুবিধা বাড়তেই থাকে, কর ফাঁকিবাজদের দাপট উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় (সাদা আয়ের করের হার যদি কালো টাকার সুদ হারের চেয়ে বেশী হয়) এবং যদি মানিলন্ডারিং সনাক্তকরণ ও যথাবিহিত বিচারের অধীনে না আনা হয় তাহলেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অব্যাহতভাব ক্রমবর্ধমানে বাড়বে কিভাবে তা বোধগম্য হচ্ছে না।

শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার জরুরীঃ
সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় একটি আপাতঃদৃষ্টিতে অজনপ্রিয় হলেও আমূল সংস্কার জরুরী হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উন্নত দেশের মতো অঞ্চল বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি করা, স্কুল ইউনিফর্ম চালু করা, ব্যক্তিগত যানবাহন নয় বরং প্রয়োজন হলে স্কুল কলেজের বাসে যাতায়াত, খেলাধূলা ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ, বেতন ভাতা সুযোগ সুবিধা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে শিক্ষকমন্ডলীকে টিউশন থেকে ক্লাশমুখী করা, নোটবই / গাইড ও কোচিং সেন্টারের দৃঢ়হস্ত নিয়ন্ত্রণ তথা কালক্রমে বন্ধ করা না হলে দেশের দৃষ্টিনন্দন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং হৃদয় উষ্ণ করা সামাজিক অগ্রযাত্রা ধরে রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। ভারতে আগামী বছর থেকে এসএসসি পরীক্ষা বোর্ড পর্যায়ে আর হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আমাদের পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষা অভিভাবককে বিষাদময় করে তোলে; কভিড-১৯ এর কারণে এটা এখন স্থগিত / বাতিল করা যেতে পারে এবং ছাত্রছাত্রীদের তোতাপাখির মুখস্তবিদ্যার দিকে নিয়ে যাচ্ছে কি-না সে বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ নিরীক্ষা করানো প্রয়োজন। মাধ্যমিকে বৃত্তিমূলক এবং উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তি শিক্ষা বিষয়ে সদাশয় সরকারের যে সিদ্ধান্ত রয়েছে তা কৃতসংকল্পতার সাথে পিপিপি সহযোগে বাস্তবায়ন করা সমীচিন হবে। লেখাপড়াকে ব্যবহারিক প্রায়োগিক করতেই হবে এবং সেজন্য চাকরী দানকারী কর্পোরেট ও শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ ও মত বিনিময় করে পাঠ্যক্রম তৈরী করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পালাক্রমে তাত্বিক ও প্রায়োগিক হাতে কলমে শিক্ষা গ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আদলে কো-অপারেটিভ শিক্ষার প্রচলন করা সঠিক হবে। শীতকালে উচ্চশিক্ষার বিদার্থীগণকে এক সেমিস্টারের জন্য পল্লী বাংলার কিষাণ কিষাণীর তত্বাবধানে পাঠানোর কথা ভাবা যেতে পারে। বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে ইনকিউবেটর স্থাপন করে একদিকে প্রকল্প প্রণয়নে প্রশিক্ষণ ও অন্যদিকে উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে হাতে কলমে শিক্ষার ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবী।

দুর্নীতি দমন ও নানাবিধ সংস্কার

দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রিতা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনেককেই নিরুৎসাহিত করছে। আমরাও গভীরভাবে উৎকণ্ঠিত। বাংলাদেশ ২০১৭ সনে মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে টপকে গেছে। ২০২৯ সনে ভারতকেও স্থায়ীভাবে টপকে যেতে পারে বলে ব্লুমবার্গ, এইচএসবিসিসহ একাধিক পূর্বাভাস রয়েছে। তবে সম্প্রতি রপ্তানী আয়ে ধীরগতি চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থযুদ্ধের ফলে চৈনিক বহু কোম্পানী বাংলাদেশে স্থানান্তরের পরিবর্তে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তুরষ্ক, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে অনমনীয়তা সৃষ্ট টাকার অতি মূল্যায়ন (যা বৈদেশিক মুদ্রায় রপ্তানী পণ্যের দাম অবমূল্যায়নকারী দেশের তুলনায় বাড়িয়ে দেয়) রপ্তানীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তৈরী পোষাকে এর প্রভাব বিশাল; যখনই ভিয়েতনাম তার মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে তখনই বৈদেশিক মুদ্রায় ঐ দেশের তৈরী পোষাকের মূল্য কমে যায়। ক্রেতাগণ সেই হ্রাসকৃত মূল্য বাংলাদেশের তৈরী পোষাক রপ্তানীকারকদের উপর চাপিয়ে দেয়। শতকরা ০১ ভাগ আরএমজি ভর্তূকী ও রেমিটেন্সে ২% প্রনোদনা মাল্টিপল এক্সচেঞ্জ রেটের ক্ষতিকারক দুর্বল সমাধানে না গিয়ে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নে স্থানীয় মুদ্রায় বর্তমান গতির চেয়ে দ্রুততর অবমূল্যায়ন করা জরুরী। এতে ভোগের আমদানী (শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ) কমতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপে বস্ত্রশিল্পের প্রসার ঘটিয়ে (ব্যাপক সরকারী প্রনোদনার প্রয়োজন হবে) বছরে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের বস্ত্র আমদানী কমানো যাবে। লীড টাইম ৪২ দিন থেকে ০২ দিনে হ্রাস পাবে। বাড়বে রুলস অব অরিজিন যা বহিঃবাণিজ্যে সুবিধা দেবে। রপ্তানী খাতে বহুমুখীকরণের বিরাট সুযোগ কাজে লাগানো যায়। বিশ^মানে উন্নীত করে বিএসটিআইকে বিশ^ময় গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারলে পুনঃপরিদর্শনের সময় ও অর্থ অপচয় বাঁচানো যাবে। তাছাড়া মানবসম্পদের সেবার মান যদি বিএসটিআই বিশ^মানে করতে পারে তাহলে রিক্রুটিং এজেন্টদের মধ্যে যারা দুবৃত্তায়িত মধ্যস্বত্তভোগী তাদের প্রতাপ কমানো যাবে। প্রামাণিত দক্ষতার পাদুকা, ঔষধ, জাহাজ নির্মাণ, মটর সাইকেল, প্ল্যাস্টিক পন্য, হিমায়িত কাঁচা মাছের বদলে রান্না করা আকর্ষণীয় মোড়কে মৎস ইত্যকার ক্ষেত্রে উৎপাদন ও রপ্তানী বহুমুখীকরণ সম্ভব এবং উচিত। রপ্তানী পোশাকে উচ্চমূল্যের ডিজাইন ও বিক্রির বাজারে বহুমুখীতা আনতে হলে বেশ কিছু বিনিয়োগ করে নিজস্ব ডিজাইনের ব্যবস্থা করতে হবে। এদেশে যৌথ উদ্যোগে কয়েকটি দেশ মটরযান বানাতে চায়; উপযুক্ত নীতি কৌশলে এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে এ ক্ষেত্রে বিপুল পদক্ষেপ সম্ভব।

উন্নয়ন মডেলের বিকল্প চিন্তা : শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আয় রোজগার বৃদ্ধি, দারিদ্র নিরসন ও বৈষম্য হ্রাস

উন্নয়ন অগ্রযাত্রার মডেলকে শিল্পায়ন তথা কর্মসংস্থানমূলক অর্থাৎ আয় রোজগার বৃদ্ধি আনয়নে দারিদ্র নিরসন ও বৈষম্য দূরীকরেণর স্থির নিশ্চিত যাত্রা পথে এগুতে হবে। এক্ষেত্রে গত বছর মন্ত্রিসভায় পাশ হওয়া অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিষয়ক নীতিমালা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সংজ্ঞায়িত কটেজ, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যাপক বিস্তার ঘটানো সম্ভব এবং উচিত। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে এসকল খাতে কর্মসংস্থান হয় মোট কর্মজীবীর দুই-তৃতীয়াংশ। তাই আমাদেরও এ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বর্তমানের শতকরা ২৫ ভাগ (এডিবি) বা শতকরা ৩৫ (পরিকল্পনা কমিশন) ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে মূলধন কম লাগে, বিনিয়োগ থেকে উৎপাদনে যাওয়ার সময় লাগে অতি স্বল্প, ব্যবহৃত হয় দেশী কাঁচামাল, প্রযুক্তি জানা আছে, আমদানী নাই, উৎপাদিত পন্যের দেশে বিদেশে বাজার আছে বিপুলভাবে আত্মকর্ম ও মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থান এটিই বাংলাদেশের মোক্ষম সুযোগ। সম্ভবতঃ মাঝারি ক্যাটাগরীকে বাদ দিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা এনে, এসএমই ফাউন্ডেশন বা বিসিককে শক্তিমান করে সরকারের আকর্ষণীয় প্রনোদনা ও নিবিড় প্রশিক্ষণ ও সংগঠন ২০২১ সনে এর শুভ সূচনা হতেই পারে। কভিড-১৯ এর ক্ষয়ক্ষতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুঃসাহসী এক লক্ষ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে যে ২০০০০ কোটি টাকার এস.এম.ই অংশটি রয়েছে (আরও ২৭০০ কোটি নতুনভাবে ঘোষিত) তা কিন্তু তেমন ব্যবহার হচ্ছে না। আমূল সংস্কারে কাঠামোগত পরিবর্তন করে কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিটগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যাংকিং সেবা দান জরুরী। এটা ছাড়া কভিড-১৯ এ চাকুরিচ্যুত এবং বিদেশ ফেরতগণের কর্মসংস্থান তথা আয় রোজগার বৃদ্ধি করে আয়, সম্পদ ও সুযোগ বৈষম্য হ্রাস করা যাবে না।

মধ্যস্বত্তভোগীদের শক্তিতে রাষ্ট্রশক্তির রাশ টানা জরুরী

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম বহুবিধ অর্জনের ফসলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ধান-চাল, পেঁয়াজ ও আলুতে উৎপাদন ও বিপনন সমবায় ব্যবস্থা চালু করে মধ্যস্বত্তভোগী দুষ্টচক্র মিলমালিক অসাধু খাদ্য কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীগণের আকাশছোয়া মুনাফা কমাতে হবে- নইলে কিষাণ কিষাণী তার উৎপাদনে ন্যায্য মূল্য পাবে না আর ভোক্তাদের গুণতে হবে অতিরিক্ত দাম। অনুরূপভাবে ব্যাংক বীমা খাতে বিশেষ করে ব্যক্তিখাতে যে সিন্ডিকেট তৈরী হয়েছে তার ফলে আমানতে ব্যাংক সুদের হার মূল্যস্ফীতি হারের চেয়ে কম। শক্তিধর মধ্যস্বত্তভোগীরা আইনের ফাঁক ফোকর বের করে রাষ্ট্রকে ঠকিয়ে বিদেশে মুদ্রাপাচার করছে আমদানীতে, অভারইনভয়েসিং এবং রপ্তানীতে আন্ডারইনভয়েসিং মাধ্যমে। এরা রাষ্ট্রযন্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশকে দুর্নীতিগ্রস্থ করে কেনাকাটায় সাগরচুরি করছে। এ সকল বিষয়ে বিশ^নন্দিত রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে এনে যথাবিহিত করা না হলে রাষ্ট্র ও জাতিকে তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর গন্তব্য অনেক দূরে চলে যাবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদে সকল কেনাকাটা ই-টেন্ডারিং এ করার নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হউক। প্রতিটি ক্ষেত্রে তা রাস্তা নির্মাণ হউক কিংবা বালিশ ক্রয় কিংবা ঔষধ কেনা। বিশেষজ্ঞ পরামর্শে অভিহিত মূল্য নির্ধারণ করে টেন্ডার করা হলে যে সকল ঠিকাদার বা সরবরাহকারী ঐ মূল্যের বেশী দামে টেন্ডার দেবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাদ পড়ে যাবে। যারা সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করবেন না তাদের জরিমানার বিধানে সজাগ ও সচেতন করে দুর্নীতি, অপচয় ও দীর্ঘসূত্রিতা কমালেই বিনিয়োগ তার সঠিক উৎপাদনশীলতা দিয়ে প্রবৃদ্ধিকে সমৃদ্ধতর করবে।

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন  : সাবেক গর্ভনর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদ




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top