ফিলিস্তিনিদের রক্তে রঞ্জিত ইসরায়েলের ক্ষমতার রাজনীতি | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি

ফিলিস্তিনিদের রক্তে রঞ্জিত ইসরায়েলের ক্ষমতার রাজনীতি

মো. জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ১৬ মে ২০২১ ০৯:২৬ আপডেট: ১৬ মে ২০২১ ০৯:২৮

মো. জিল্লুর রহমান | প্রকাশিত: ১৬ মে ২০২১ ০৯:২৬

UCBL

লেখক

জেরুজালেমে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কট্টর ইহুদি এবং ইসরায়েলি পুলিশের সঙ্গে মুক্তিকামী মজলুম ফিলিস্তিনিদের যে ছোটখাটো সংঘাত চলছিল তা ১০ মে বিপজ্জনক এক লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে। জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ চত্বরে ঢুকে ইসরায়েলি পুলিশের বেধড়ক লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস এবং রাবার বুলেটে তিনশরও বেশি ফিলিস্তিনি আহত হওয়ার পর গাজা ভূখণ্ড থেকে সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোড়া শুরু করেছে। এসব হামলা ও পাল্টা হামলার পিছনে ইসরায়েলের আভ্যন্তরিণ ক্ষমতার রাজনীতি কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এবারের সংঘাতের সূত্রপাত জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে। রমজানের সময় পুলিশের বাড়াবাড়ি এবং আদালতের মাধ্যমে কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উৎখাতের বিতর্কিত একটি তৎপরতা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন দফার এই বিরোধ।

পূর্ব জেরুজালেমের আরব অধ্যুষিত এলাকা শেখ জারাহ থেকে চারটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে বাড়িছাড়া করার এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শেখ জারায় যে জমির ওপর ওই চারটি ফিলিস্তিনি পরিবার গত প্রায় ৭০ বছর ধরে বসবাস করছে- হঠাৎ তার মালিকানা দাবি করে বসে কয়েকজন কট্টরপন্থী ইহুদি। জেরুজালেম নগর কর্তৃপক্ষ এবং শহরের একটি নিম্ন আদালত সেই দাবির পক্ষে রায় প্রদান করে। ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভের সূচনা মূলত সেখান থেকেই। বহুদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের মধ্যে প্রবল সন্দেহ দানা বেঁধেছে যে ইসারায়েলি দক্ষিণপন্থীরা জেরুজালেম থেকে নানা কৌশলে তাদের উৎখাত করতে বদ্ধপরিকর এবং শেখ জারাহ থেকে ওই চারটি পরিবারকে বাড়িছাড়া করার সিদ্ধান্ত পূর্বপরিকল্পিত সেই ছকেরই অংশ। শেখ জারাহ এবং জেরুজালেমের পুরনো এলাকার বিভিন্ন জায়গায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফিলিস্তিনি কিশোর তরুণদের সাথে লেহাবা এবং আরো কিছু কট্টর ইহুদি সংগঠনের সদস্যদের সাথে বিচ্ছিন্নভাবে হাতাহাতি, গালিগালাজ বিনিময় চলছিল। এরই মধ্যে রোজার শুরুতে পুলিশ জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের ওপর কিছু বিধিনিষেধ বসালে পরিস্থিতির আরো ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

আবার অনেকে বলছেন, জেরুজালেম দিবসে কট্টর ইহুদীদের পতাকা মিছিলের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনার সূত্রপাত। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের স্মরণে এই দিবসটি ইহুদীরা পালন করে থাকে। যদিও দিনটি আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃত নয়। প্রতিবছর ১০ মে এই উপলক্ষে কয়েক হাজার ইহুদি পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি এলাকার ভেতরে দিয়ে মিছিল করে। আবার অনেক ফিলিস্তিনি বহুদিন ধরেই রোজার সময় পুরনো শহরের দামেস্ক গেটের চত্বরে সন্ধ্যায় জমা হয়ে ইফতার করে। এবার ইসরায়েলি পুলিশ হঠাৎই তা নিষিদ্ধ করে - যা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়। সেই সাথে যোগ হয় কট্টর ইহুদিদের ‘জেরুজালেম দিবস‘ কুচকাওয়াজ নিয়ে উত্তেজনা। ঘটনাক্রমে এবছর দিনটি পড়েছে রোজার ভেতর। ফিলিস্তিনিরা চেয়েছিল এবার যেন ওই মিছিলের গতিপথ বদলানো হয়। কিন্তু ইসরায়েলি পুলিশ বা নগর কর্তৃপক্ষ তাতে কান দেয়নি যা নিয়ে ফিলিস্তিনিরা ক্ষুব্ধ ছিল । তবে ১০ মে ২০২১ শেষ মুহূর্তের এক সিদ্ধান্তে মিছিলটি ফিলিস্তিনি এলাকায় যেতে দেওয়া হয়নি।

আসলে গত দুই বছর ধরে ইসরায়েলে একের পর এক নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পরও বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু শরিক জোগাড় করে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট বিরোধী ইয়েস আডিট দলের নেতা ইয়ার লাপিডকে সরকার গঠনের সুযোগ দেন। সরকার গড়তে হলে আরব দলগুলোর সমর্থন দরকার লাপিডের। সেই চেষ্টা তিনি করছিলেন। ইসরায়েলে সর্বশেষ চতুর্থ দফা নির্বাচন হয়েছে গত ২৩ মার্চ ২০২১ সোমবার। এই নির্বাচনেও নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট রুভেন রিভলিন গত ৬ এপ্রিল ২০২১ নেতানিয়াহুকে সরকার গঠনের অনুমতি দেন। তাঁকে সময় বেঁধে দেওয়া হয় ৪ মে ২০২১ পর্যন্ত। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হন নেতানিয়াহু। এর মধ্য দিয়ে দেশটির বিরোধীদের সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন জেরুজালেমের ঘটনাপ্রবাহ, ফিলিস্তিনি পরিবার উচ্ছেদের ঘটনায় আরব দলগুলো আর কথা বলতে চাইছে না। অন্যদিকে ১০ মে ২০২১ পর লাপিড এবং তার বর্তমান শরিকদেরও এখন সরকার ও সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকছে না।

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট রুভেন রিভলিন সম্প্রতি আক্ষেপ করে বলেছেন অভ্যন্তরীণ যে রাজনৈতিক বিরোধ ও সংকট তৈরি হয়েছে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এই কথা বলার সময় তিনি কেঁদে ফেলেন। তিনি বিগত সাত বছর ধরে প্রেসিডেন্টের পদে এবং এরও আগে ১৩ বছর সংসদ স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকে তার জীবনের জন্য দুঃখজনক হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে তৎপরতার বিষয়ে একটি কাঠামো গড়ে না উঠলে ইসরায়েলের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।

ইসরায়েলের সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংকট শুরু হয় মূলত ২০১৮ সালে। এই বছরের ডিসেম্বরে নেতানিয়াহুর দল ও জোট সঙ্গীরা পরের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের এপ্রিলে নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়। এরপর ২০১৯ সালের এপ্রিলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে দুই প্রধান দলই আসন পেয়েছিলেন ৩৫টি করে। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসনসংখ্যা ১২০টি। তবে সরকার গঠনের জন্য ৬১টি আসন প্রয়োজন। ফলে নেতানিয়াহু এবং বিরোধী নেতা বেনি গান্টজের দল ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টিও সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়। এরপর আরও দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোনো দলই সরকার গঠন করতে পারেনি। আর গত মার্চের চতুর্থ নির্বাচনের পরও সরকার গঠনে ব্যর্থ হন দেশটিতে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলে গত দু'বছরের মধ্যে চতুর্থবারের মতো একই সমস্যা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বা তার প্রতিপক্ষ - কেউই আসলে ক্ষমতায় যাবার মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। আর এর মধ্যেই কিংমেকার হয়ে উঠেছে রাম (Raam) নামে একটি ইসলামপন্থী আরব দল (ইউনাইটেড আরব লিস্ট হিসেবেও দলটি পরিচিত)। এবারের নির্বাচনে এ দলটি পাঁচটি আসনে জয় পেয়েছে- যা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখা বা ক্ষমতা থেকে বিদায় করে দিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিয়েছে।

ইসরায়েলের সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংকট শুরু হয় মূলত ২০১৮ সালে। এই বছরের ডিসেম্বরে নেতানিয়াহুর দল ও জোট সঙ্গীরা পরের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের এপ্রিলে নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়। এরপর ২০১৯ সালের এপ্রিলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়

 

এখানে উল্লেখ্য যে, ইহুদীবাদী ইসরায়েলের প্রায় নব্বই লাখ মানুষের মধ্যে উনিশ লাখের মতো আরব আছেন যারা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের সীমানায় থেকে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছিল অথবা তাদের বহিষ্কার করা হয়েছিলো। যদিও ইসরায়েলের নাগরিক এমন অনেক আরব নিজেদের ফিলিস্তিনি বা ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি হিসেবে পরিচিত হতে পছন্দ করেন আর অন্যরা নিজেদের ইসরায়েলি আরব হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। ইসরায়েলে আরবদের বেশিরভাগই সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী আর দ্বিতীয় বড় অংশটি খ্রিস্টান। ইসরায়েলের দশ শতাংশ মুসলিম আরব বেদুইন গোত্র থেকে আসা এবং ১৯৪৯ সালের নির্বাচনে তারা অংশ নিয়েছিলো। আরব রাজনৈতিক দলগুলো দেশটিতে আরবদের সমান অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে এবং একই সাথে ফিলিস্তিনের প্রতিও তাদের সমর্থন আছে।

রক্ষণশীল মুসলিম মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বে রাম দলটি মূলত ফিলিস্তিনের গাজা শাসন করা হামাসের ধর্মীয় ভাবধারায় গড়ে ওঠা একটি ইসলামপন্থী দল। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি শুরু থেকে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট আসন পেয়ে আসছে। যদিও দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ ২০০৯ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল কিন্তু পরে সুপ্রিম কোর্ট ওই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেয়। ৪৬ বছর বয়সী মানসুর আব্বাস হলেন দলটির মূল ব্যক্তি। ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে তিনি এখন রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছেন। তিনি জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা দন্ত চিকিৎসক। যদিও পরে হাইফা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৯ সালে তিনি ইউনাইটেড আরব লিস্টের নেতা মনোনীত হন এবং ওই জোটের অংশ হিসেবে পার্লামেন্টেও নির্বাচিত হন।

২০২০ সালে ইসরায়েলের আরব রাজনৈতিক দলগুলোর জোট- জয়েন্ট আরব লিস্টের অংশ ছিল যারা নজিরবিহীনভাবে ১৫টি আসন পেয়েছে পার্লামেন্টে। তবে একাই নির্বাচনে লড়ার জন্য চলতি বছরের ২৮শে জানুয়ারি ওই জোট ছেড়ে আসে রাম। আরব সম্প্রদায়ের সামগ্রিক দরকষাকষির ক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেললেও এ সিদ্ধান্ত দলটির 'কিংমেকার' হয়ে ওঠার পথও তৈরি করে দিয়েছে। অবশ্য বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার লিকুদ পার্টির সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি দলের মধ্যে বিভক্তিও তৈরি করেন।

যদিও সংবাদ মাধ্যম বলছে, নেতানিয়াহুর অন্য শরীকদের সাথে তারা কিভাবে একযোগে কাজ করবেন তা এখনো পরিষ্কার নয়। জেরুজালেমে কোয়ালিশনে না থেকেও নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেয়ার চুক্তি করতে পারে রাম। কিন্তু চুক্তি বা সমঝোতা যাই হোক- আব্বাস এখন নিশ্চিত যে দরকষাকষির সুযোগ তার হাতে। তিনি অবশ্য বলছেন ইসরায়েলের আরব জনগোষ্ঠীর জন্য সেরা সিদ্ধান্তটিই তিনি নেবেন। যদিও অনেকেই এখনো এ নিয়ে নিশ্চিত নন। তারা বলছেন, লিকুদ ও রাম দলের জোট ফিলিস্তিনিদের জন্য ভালো হবে না।

তবে জোট সরকারের গঠনে লাপিডের চেষ্টা ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। সুতরাং চলতি এই সংঘাতের রাজনৈতিক ফায়দা এখন নিশ্চিতভাবেই পাবেন নেতানিয়াহু। এখন পরিস্থিতির চাপে লাপিড যদি জোট গঠনে ব্যর্থ হন, তাহলে ইসরায়েলে আরেক দফা নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং ফিলিস্তিনিদের সাথে চলতি এই বিরোধ হয়তো সেই নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সাহায্য করতে পারে। বলা হচ্ছে দুই বছরের মধ্যে পঞ্চম সংসদ নির্বাচন হতে পারে ইসরায়েলে এবং হামাস ইসরায়েলের যুদ্ধের ফল কোন দিকে যায়, তা এখনই বলা মুশকিল।


লেখক : ব্যাংকার ও মুক্তমনা কলাম লেখক




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top