মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি বনাম আয়-বৈষম্যের বাজেট  | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি বনাম আয়-বৈষম্যের বাজেট 

মো. জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ৬ জুন ২০২১ ১২:২৪ আপডেট: ৬ জুন ২০২১ ১২:২৯

মো. জিল্লুর রহমান | প্রকাশিত: ৬ জুন ২০২১ ১২:২৪

UCBL

অলংকরণ : রাজিব হাসান

আমাদের দেশে সংসদে বাজেট পেশ করার সাথে সাথেই দাম বাড়ানোর হিড়িক পড়ে যায়। এতে সমস্যায় পড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। যারা দাম বাড়ায় তারাও জানে না, কেন বাড়াচ্ছে। আসলে এর মাধ্যমে মুষ্টিমেয় শ্রেণির মানুষ অধিক সুবিধা নিচ্ছে আর অধিকাংশ মানুষ শুধুই বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা জানি, শুধু মাথাপিছু আয় নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকেও বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে যদিও নভেল করোনা ভাইরাস সব হিসাব নিকাশ উল্টোপাল্টা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে এবং মানুষের আয়বৈষম্য তার একটি।

আসলে, মাথাপিছু আয় বলতে সাধারণতঃ কোন দেশের মোট আয়কে জনপ্রতি ভাগ করে দিলে যা হয়, তাকে বোঝায়। জনগণের সর্বমোট ব্যক্তিগত আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। সাধারণতঃ মাথাপিছু আয়কে প্রতিবছর টাকার এককে প্রকাশ করা হয়। পক্ষান্তরে, মোট দেশজ উৎপাদন (ইংরেজিতে জিডিপি) হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক বছরে কোনো দেশের অভ্যন্তরে বা ভৌগোলিক সীমানার ভিতরে বসবাসকারী সকল জনগণ কর্তৃক উৎপাদিত চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকর্মের অর্থমূল্যের সমষ্টি। এতে উক্ত সীমানার মধ্যে বসবাসকারী দেশের সকল নাগরিক ও বিদেশি ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকর্মের মূল্য অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে বিদেশে অবস্থানকারী ও কর্মরত দেশের নাগরিক/সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের আয় অন্তর্ভুক্ত হবে না।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে বর্তমানে দেশে মাথাপিছু আয় ২,২২৭ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং বিদায়ী অর্থবছর ২০১৯-২০ শেষে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ২,০৬৪ ডলার। অর্থাৎ দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় এক বছরের ব্যবধানে ১৬৩ ডলার বেড়েছে, যা আগের বার থেকে ৯ শতাংশ বেশি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় মানুষের মাথাপিছু আয় বছরে দাঁড়াচ্ছে গড়ে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭০ টাকা। অর্থাৎ মাসে গড় আয় প্রায় ১৫ হাজার ৭৩৯ টাকার মতো।

যদিও সঠিক জাতীয় আয়ের হিসাবটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। অনেক রকম বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। যেমন দ্বৈত গণনা সমস্যা। জাতীয় আয় গণনার ক্ষেত্রে অনেক সময় একটি দ্রব্য দু'বার গণনা করা হতে পারে। যেমন বই ও কাগজের ক্ষেত্রে যদি বই ও কাগজের মূল্য উভয়ই জাতীয় আয়ের মধ্যে গণনা করা হয়, তাহলে জাতীয় আয়ের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না। কারণ বইয়ের মূল্যের মধ্যে কাগজের মূল্য অন্তর্ভুুক্ত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একবার কাগজের মূল্য এবং সেই সঙ্গে বইয়ের মূল্য পৃথকভাবে হিসাব করা হলে প্রকৃতপক্ষে কাগজের মূল্য দু'বার গণনা করা হয়। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২,২২৭ মার্কিন ডলার। কিন্তু সমাজে বিশেষ করে নিম্ন-আয়ের মানুষের কতটা অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, তা বাস্তবে দেখলেই অনুমান করা যায়।

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৯৭২ সালে ছিল প্রায় ১২৯ ডলার যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২,২২৭ অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় অন্তত ১৭ গুণ বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারের বেশি। ওই সময়ে হত দরিদ্রের হার কমে শূন্যের ঘরে নেমে আসবে। আর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে 'বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১' শীর্ষক প্রতিবেদনে এই লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

মজার বিষয় মাথাপিছু আয় বেশি হওয়া মানেই যে কোনো দেশের মানুষ খুব ভালো আছে তা নয়। আমাদের অনেকের ধারণা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি মানেই দেশ অনেক উন্নত হয়েছে কিংবা মানুষের জীবন মানের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেশি মানেই যে একটি দেশ খুব ভালো আছে তা কিন্তু নয়। ধরা যাক, একজনের আয় নয় হাজার টাকা। আরেক জনের আয় এক হাজার টাকা। এর অর্থ দুজনের মাথাপিছু গড় আয় পাঁচ হাজার টাকা। তার মানে তো এই নয় যে দুজনেরই আয় সমান। সুতরাং এখানেই আয়বৈষম্যের বিষয়টি চলে আসে। সুতরাং মনে রাখতে হবে জাতীয় আয় বৃদ্ধিই উন্নয়ন নয়। উন্নয়ন আরও অনেক বড় বিষয়।

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি সুষমভাবে সম্পদ বন্টিত হচ্ছে কিনা সেটা মানুষের জীবন মান উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তি। কারণ, ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলথ এক্স ইন্সটিটিউট নামের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্ট বলছে, বিশ্বে ধনী তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ১০টি দেশের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে বাংলাদেশ। তাদের মতে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অতি ধনী বেড়েছে বার্ষিক ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। এখানে অতি ধনী বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে, যাদের মোট সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৫০ কোটি টাকা। নানা পরিসংখ্যানে প্রমাণ হয়েছে, বাংলাদেশ একটি উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ। আর এই আয়বৈষম্যের কারণে মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ জীবনমান উন্নত করার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকছে গরিব পরিবারগুলো। তাই, মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি যদিও আশাব্যঞ্জক কথা, কিন্তু একইসাথে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি সেরকমই হতাশার খবর।

২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের তথ্য অনুসারে, গত ১৫ বছরে দারিদ্র্যের হারও কমে অর্ধেক হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক পাঁচ শতাংশ হলেও, বর্তমানে এ হার ২০ দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ২০২০ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দারিদ্র্যের উপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে অর্থাৎ করোনা মহামারির আগের অবস্থার সঙ্গে পরের অবস্থা তুলনা করা হয়েছে। সানেম বলছে, করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ আর করোনার সময়ে ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে, বিবিএসের খানা জরিপ অনুসারে ২০১৬ সালে দেশের গ্রামাঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৮ সালের জিইডি-সানেম জরিপ অনুসারে যা ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

তবে, এটা সত্য বাংলাদেশে উদ্বেগজনকহারে আয় বৈষম্য বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত ১০ বছরে আয় বৈষম্য বেড়েছে ১০ থেকে ১৬ শতাংশ। কোন দেশের আয়-বৈষম্য কতটা তা পরিমাপ করা হয় গিনি সহগ দিয়ে। গিনি সহগের মান শূন্য হলে বোঝায় যে, দেশের সকলের মধ্যে চরম সমতা বিরাজ করছে; আর এর মান বাড়তে বাড়তে শূন্য দশমিক পাঁচ (০.৫) বা বেশি হলে বোঝায় যে, দেশে আয়-বৈষম্য চরমতম অবস্থায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭৪ সালে দেশে গিনি সহগের মান ছিল ০.২৪। ২০১০ সালে তা বেড়ে হয়েছিল ০.৪৫৮। ২০১৬ সালে তা আরও বেড়ে হয়েছে ০.৪৮৩। ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ১০% পরিবারের হাতে ছিল আয়ের ৩৮.১৬%। এ সময় সবচেয়ে সম্পদশালী ৫% পরিবারে আয় বেড়ে হয়েছে ২৭.৯%, যেখানে সবচেয়ে গরিব ৫% পরিবারে আয় কমে হয়েছে ০.২৩% মাত্র। আয়-বৈষম্যের এ চিত্র শহরের চেয়ে গ্রামে আরও বেশি তীব্র। এ সময় গ্রামাঞ্চলে গিনি সহগ ০.৪৩ থেকে ০.৪৫-এ এবং শহরাঞ্চলে ০.৪৫ থেকে ০.৫-এ বর্ধিত হয়। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশে যেহেতু গবেষণার সময় ধনী পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না, সেহেতু বৈষম্যের সত্যিকার চিত্র আরও ভয়াবহ বলে অনুমান করা অসঙ্গত নয়।

বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে প্রভূত উন্নতি করেছে। প্রবৃদ্ধির হিসাবে অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পায়নি। পেয়েছে গুটিকয়েক মানুষ। মাথাপিছু আয়ের হিসাবটা বরাবরই লেজেগোবরে। অনেকে দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়ে। তাদের গড় সম্পদ বেশি বলে হিসাব করা হয়। এতে হকার, রিকশাচালক, গার্মেন্ট শ্রমিক, বেকার সবাইকে মধ্যবিত্ত দেখানো হয়। আর মাঝখান থেকে ফুলেফেঁপে ওঠার দৃশ্যটা ঢাকা পড়ে যায়।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতিকরা জিডিপি বৃদ্ধির ব্যাপারে যেমন উৎসাহী এবং হৈচৈ করে থাকেন, যখন সাফল্য আসে কিন্তু বৈষম্য বৃদ্ধিতে তাদের উদ্বেগ পরিলক্ষিত হয় না। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চয় জিডিপি হিসাব করার সময় গণ্য করা হয়। কিন্তু কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেয়ে যে সর্বস্বান্ত হয়, সেটা কোনো বিবেচনায় আনা হয় না। একটি দেশকে আধা উন্নত বা উন্নত- এই খেতাব দেওয়ার আগে দেখা উচিত যে দুর্বল ও বঞ্চিত শ্রেণির নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের ভিত কতটা মজবুত হয়েছে; মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি-না।

উদার গণতন্ত্রের ওপর উদার অর্থনীতির প্রভাব অত্যন্ত বেশি। নির্বাচনে অর্থের ছড়াছড়ি দেখলে এ বিষয়টি নিয়ে আর বিতর্কের অবকাশ থাকে না। আর সে কারণে রাজনীতিকরা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়টি নিয়ে কম আগ্রহ দেখায়। সে জন্য এই বৈষম্য দূরীকরণে প্রয়োজন শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন। সেখানেও যে লুটেরাদের কালো থাবা পড়বে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে চেষ্টা চালাতে হবে।

নানা অপকৌশলে কিছু লোক শুধু শুধু টাকা পায়, আর কিছু লোক টাকা হারায়! বিবিএস প্রতি বছর যেভাবে জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের সাময়িক হিসাব করে থাকে, তেমনিভাবে যদি ঘুষ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির প্রবৃদ্ধির হিসাব করা হতো তাহলে ঐশ্রেণীর লোকগুলো এক ধরনের নৈতিক চাপের মধ্যে থাকতো। স্বাধীনতা-পরবর্তী গত পাঁচ দশকে আমরা আরও বড় লক্ষ্যে পৌঁছে যেতাম, যদি আমরা দুর্নীতিটা দূর করতে পারতাম।

মাথাপিছু আয় বাড়ার খবরটি নিঃসন্দেহে ভালো খবর। তবে সরকারকে আয়বৈষম্যের ব্যাপারটিতেও লক্ষ্য রাখতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে সুষম সামাজিক উন্নয়ন ও বাজেটের সুষম বণ্টন। কর্মহারা মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি সামাজিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হোক, এটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top