Walton

বাংলাদেশ সারা দুনিয়ার কাছে এক ঈর্ষণীয় দেশ

ড. নাজনীন আহমেদ

প্রকাশিত: ৫ এপ্রিল ২০২১ ১৬:২৮ আপডেট: ৫ এপ্রিল ২০২১ ১৬:৩৬

ড. নাজনীন আহমেদ | প্রকাশিত: ৫ এপ্রিল ২০২১ ১৬:২৮

UCBL

বাংলাদেশ সারা দুনিয়ার কাছে এক ঈর্ষণীয় দেশ

জিডিপির মূল তিনটি যে খাত কৃষি, শিল্প ও সেবা সেই খাতগুলোর মধ্যে একটা দেশ যখন উন্নত হতে থাকে বলা হয় যে তখন দেশটি কৃষি থেকে শিল্পে দিকে ধাবিত হবে। জিডিপি বেশিভাগ আসবে শিল্প থেকে। আমরা যদি দেখি আমাদের অতীত তাহলে দেখবো স্বাধীনতার পর পর বাংলাদেশ কিন্তু কৃষি নির্ভর দেশ ছিল, জিডিপির প্রায় ৫৫ ভাগই কৃষি থেকে আসতো। শিল্প থেকে আসতো মাত্র নয় শতাংশ। অথচ আজকে যদি আমাদের জিডিপির দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে, আমাদের জিডিপির প্রায় ৩৫ শতাংশ আসছে শিল্পখাত থেকে। তার মানে ধীরে-ধীরে জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান বেড়েছে। এটি কিন্তু উন্নয়নের একটি লক্ষন। অর্থনীতির তত্তে পড়ে থাকি। শিল্পখাতের এই যে উত্থান বাংলাদেশে হয়েছে সেটা মূলত হয়েছে তৈরি পোশাকখাতের হাত ধরে এবং তৈরি পোশাক রপ্তানীতে বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর ধরে কিন্তু বিশ্বে দ্বিতীয়। তৈরি পোশাকখাতের উত্থানে একদিকে পলিসিগত সুবিধা কাজ করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা ভ‚মিকা রেখেছে। তবে এখানে সব থেকে বেশি অবদান রেখেছে আমাদের শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষ করে নারী শ্রমিক। কারণ তৈরি পোশাকখাতে নারী শ্রমিকদের অংশ গ্রহণ বেশি এবং তাদের পরিশ্রমেই কিন্তু এই খাতটির অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে।

তাছাড়াও আমরা দেখি যে আমাদের চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, কৃষিজাত পণ্য কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক জাতীয় পণ্য, পাদুকা শিল্প, আমাদের রাসায়নিক শিল্পগুলোর বিকাশ হয়েছ। হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি সেখানেও কিন্তু অগ্রগতি আমরা দেখেছি। শিল্প-বাণিজ্য রপ্তানীর উত্থানের ইতিহাস যদি দেখি সেখানে আমাদের একটি উপাদান হলো অবকাঠামোগত অগ্রগতি। বিদ্যুতের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়েছে, বন্দর রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছে। এটা ঠিক এখনো আমাদের অনেকদূর যেতে হবে। আমাদের যে পরিমাণে শিল্প বাণিজ্য কিংবা রপ্তানী বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই অনুযায়ি কিন্তু আমাদের বন্দর, রাস্তাঘাট পর্যাপ্ত নয়। এসব ক্ষেত্রে আধুনিয়কায়ন করতে হবে এবং দক্ষ জনশক্তি আমাদের দরকার। আমরা শিল্পে যে ধরনের পণ্য উৎপাদন করি, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের আরো প্রতিযোগি হতে হয় তাহলে আমাদের মান বাড়াতে হবে। আর মান বাড়াতে হলে দক্ষ জনশক্তির দরকার। তাছাড়া আমাদের যে বেসরকারিখাতের উদ্যোক্তারা আছেন তাদের মধ্যে কিন্তু নতুন নতুন উদ্যোক্তারা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে আসছেন। এগুলোকে লালন করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য দিতে হবে। তারাও যেন শুধু শ্রমিক হিসেবে নয় উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। অনেক নারী উদ্যোক্তা কিন্তু এখন কাজ করছেন। তারা আরো এগিয়ে যেতে চাচ্ছেন।

শিল্প বাণিজ্য্যের অগ্রগতির জন্য আমাদের ব্যাংকিংখাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষতা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিতে আমরা যদি বিনিয়োগ করতে পারি, অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে পারি আন্তর্জাতিক বাজারে যদি কূটনৈতকি তৎপরতা বাড়াতে পারি তাহলে কিন্তু এই শিল্পখাতকে নিয়ে আমরা বহুদুর এগিয়ে যেতে পারবো। আমাদের যেমন ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প আছে সেটাও দেশের চাহিদা মেটাচ্ছে। বিদেশেও কিন্তু রপ্তানী সম্ভাবনা প্রচুর। এখন যতটা রপ্তানী করি আরো অনেক বাড়াতে পারি। কাজেই সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের ইতোমধ্যে দেযা শিল্পনীতি, আমদানী-রপ্তানী নীতি, এসএমই উন্নয়ন নীতি এইসব যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে কিন্তু শিল্পখাত নিয়ে আমরা আরো বহুদুর এগুতে পারবো।

আগামীতে যদি এগুতে হয় তাহলে বিগত ৫০ বছরে যে পরিকল্পনায় আমরা চলেছি সেভাবে আগামী ৫০ বছর চললে হবে না। আমাদেরকে দক্ষ জনশক্তির দিকে নজর দিতে হবে। বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ খুবই দ্রুততার সাথে করতে হবে। আমাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়াতে হবে

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে শুধু বাংলাদেশের মানুষ না সারাদুনিয়া জোড়া মানুষ দেখছে বাংলাদেশের এই উন্নয়ন। আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছি যে দেশটির ভবিষ্যত কেউ চিন্তা করেনি। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। শিল্প নাই, কলকারখানা ধ্বংস হয়ে গেছে। বুদ্ধিজীবীদের মেরে ফেলা হয়েছে। সে রকম একটি দেশে রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ কালভার্ট অনুন্নত। যেখানে প্রচুর জনসংখ্যা। এমনটা দেখে মানুষ কেবল কোনো রকমে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকবে এটাই ছিল চিন্তার ব্যাপার। সেই তলাবিহীন ঝুঁড়ি আখ্যায়িত বাংলাদেশ আজকে সম্ভাবনার বাংলাদেশ এবং সেই বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে এটি উন্নয়নের রোল মডেল। যে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বাধীন হতে দিতে চাইছিল না, যে পাকিস্তান মনে করেছিল তারা অনেক সুপিরিয়র। আজকে বাংলাদেশের বিরোধী শক্তি যারা মনে করেছিল পাকিস্তানের সাথে থাকাটাই বোধহয় লাভজনক তাদের দিকে তাকিয়ে বলতে চাই যে, আজকে যদি আমরা বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের অবস্থান দেখি তাহলে আমরা দেখবো, পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় সাড়ে ১১শ ডলার। সেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২০৬৪ ডলার। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছরেরও বেশি সেখানে পাকিস্তানের মানুষের গড় আযূ ৬৭ বছর। অর্থাৎ আমারা যদি আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা সূচকের দিকে তাকাই, যদি নারীর ক্ষমতায়নের দিকে তাকাই তাহলে আমরা দেখবো যে পাকিস্তানের থেকে বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে গেছে। সেটা কেবল ফরেন কারেন্সি রিজার্ভে নয়, জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নয়। গুনগত যে উন্নয়ন সেই উন্নয়নে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে বহুদূর এগিয়ে গেছে। পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ, চিন্তাবিদরাই বলছেন যে, বাংলাদেশের কাছ থেকে পাকিস্তানের শেখা উচিত কি করে উন্নয়ন করতে হয়, কি করে দারিদ্র বিমোচন করতে হয়; কি করে দেশের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়। আমরা যদি খেয়াল করি তাহলে দেখবো যে, বাংলাদেশের নারী শক্তিকে যেভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, আমাদের শিক্ষায় বৃত্তি দেয়া থেকে শুরু করে, নারীকে কল কারখানায় শ্রমবাজারে যেভাবে নারী আসছে, সেভাবে কিন্তু পাকিস্তানে হয়নি। আমাদের মাইক্রো এন্টারপ্রাইজে নারীরা ব্যাপক ভাবে অংশ নিচ্ছে। এটা বাংলাদেশের উন্নয়নের বিশেষ দিক বলে মনে করি।

তাছাড়া আমাদের সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় অবকাঠামোর উন্নয়ন যে ভূমিকা রেখেছ, আমাদের বেসরকারিখাত যেভাবে এগিয়ে এসেছে। এর সাথে আছে ব্যাংকিংখাত, সর্বোপরী আমি বলবো যে, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের যে শ্রম আমরা সেটা ভুলে যাই। আমরা বলি সস্তা শ্রম। এই শ্রমজীবী মানুষের যে কঠোর পরিশ্রম, তার বিনিময়ে তারা কিন্তু নিয়েছে কম, দেশকে দিয়েছে বেশি। অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষতার শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিয়েছে কম দেশকে দিয়েছে অনেক। তার মাধ্যমেই কিন্তু দেশের কৃষি, শিল্প সেবাখাতের ভিত্তি পাকা হয়েছে।

আজকের বাংলাদেশ সারা দুনিয়ার কাছে এক ঈর্ষণীয় বাংলাদেশ। সমস্যা আছে। অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। আগামীতে যদি এগুতে হয় তাহলে বিগত ৫০ বছরে যে পরিকল্পনায় আমরা চলেছি সেভাবে আগামী ৫০ বছর চললে হবে না। আমাদেরকে দক্ষ জনশক্তির দিকে নজর দিতে হবে। বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ খুবই দ্রুততার সাথে করতে হবে। আমাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়াতে হবে। তবে সব চেয়ে বেশি যেটা জরুরি বলে আমি মনে করি সেটা হচ্ছে সুশাসন। দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশে পরিণত করতে পারবো। যে পাকিস্তান ভেবেছিল পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেলে বাংলাদেশের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না, তারা আজ আমাদের কাছ থেকে শিখছে, তারা আজ বাংলাদেশের উন্নয়নকে দেখছে-এটাই আমাদের বড় অর্জন।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বিআইডিএস।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top